সরকারি সফর ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে: টেকসই প্রবৃদ্ধি এখনো স্বপ্ন
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বছরেই এফডিআই ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত।”
সরকারি সফর ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে: টেকসই প্রবৃদ্ধি এখনো স্বপ্ন
বাংলাদেশে পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) স্টক বিবেচনায় শীর্ষ উৎস দেশ যুক্তরাজ্য। কিন্তু দেশটি থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের নিট প্রবাহ কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় বড় ধরনের পতন।
বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক বণিক বার্তা'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিনিয়োগ আকৃষ্টে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন একাধিক দেশে সফর করলেও বিনিয়োগ প্রবাহে এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। লন্ডন, ওয়াশিংটন, বেইজিং, টোকিও, দোহা ও ইস্তাম্বুলসহ বিভিন্ন রাজধানীতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হলেও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, চীন ও ভারত—এই প্রধান উৎস দেশগুলোর বেশিরভাগ থেকেই বিনিয়োগ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে নিট এফডিআই প্রবাহ বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। তবে এ বৃদ্ধির মূল কারণ নতুন বিনিয়োগ নয়; বরং বিদ্যমান বিদেশী কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ (Reinvested Earnings) ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ (Intra-company Loan) বৃদ্ধি। বিপরীতে ইকুইটি ক্যাপিটাল, অর্থাৎ নতুন মূলধন বিনিয়োগ কমেছে ১৬ দশমিক ৯০ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন বিনিয়োগ না বাড়া বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতি আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংকট ও মুনাফা প্রেরণের জটিলতায় অনেক বিদেশী প্রতিষ্ঠান দেশে পুনর্বিনিয়োগে বাধ্য হয়েছে। ফলে এফডিআই প্রবাহ বাড়লেও নতুন বা গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ আসছে না, যা টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা।”
এফডিআই স্টকের শীর্ষ দশ দেশের তালিকায় যুক্তরাজ্যের পর রয়েছে সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেদারল্যান্ডস থেকে বিনিয়োগ বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে—প্রায় ১,৮০০ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই প্রবাহ মূলত আকিজ গ্রুপের টোব্যাকো ব্যবসা অধিগ্রহণের বিপরীতে জাপান টোব্যাকোর (জেটি) অর্থ পরিশোধ, যা নতুন বিনিয়োগ নয়।
বিডার পক্ষ থেকে নিট এফডিআই বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখানো হলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “ইকুইটি ক্যাপিটাল কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। এটি ইঙ্গিত করে যে নতুন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজারে আস্থা পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ টেকসই হবে না।”
অন্যদিকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বছরেই এফডিআই ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত।”
তবে বাস্তবতা হলো—সফর বাড়ছে, কিন্তু অনিশ্চয়তাও বাড়ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মূলধন আনার পরিবর্তে নিজেদের আয় থেকেই পুনর্বিনিয়োগ করছে। নতুন প্রকল্প বা গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, ও নীতিগত নিশ্চয়তা। এগুলোর অভাবে বিদেশী বিনিয়োগের আগ্রহ কমছে, আর টেকসই প্রবৃদ্ধি এখনো রয়ে গেছে “স্বপ্ন” পর্যায়ে।