“ত্যাগ আর জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়েও উপেক্ষিত”—আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপির তৃণমূলের ক্ষোভে উত্তাল চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব লায়ন আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় ক্ষোভে উত্তাল তৃণমূল। নয় বছরের কারাবাস, ত্যাগ ও আপোষহীন অবস্থানের পরও উপেক্ষিত এই নেতার সমর্থনে মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন কর্মীরা। তৃণমূলের দাবি—আসলাম চৌধুরীই সীতাকুণ্ডের প্রকৃত প্রতিনিধি, তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়া দলের জন্য বড় ভুল হবে।

PostImage

“ত্যাগ আর জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়েও উপেক্ষিত”—আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপির তৃণমূলের ক্ষোভে উত্তাল চট্টগ্রাম


চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েছেন সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব লায়ন আসলাম চৌধুরী। দলীয় উচ্চপর্যায়ের এ সিদ্ধান্তে চট্টগ্রামজুড়ে, বিশেষ করে সীতাকুণ্ড, ফেনী ও নোয়াখালীতে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কারাবাস, নির্যাতন ও দলীয় আদর্শে আপোষহীন অবস্থান নেওয়া এই নেতাকে মনোনয়ন না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ কর্মীরা রাস্তায় নেমে পড়েছেন—কেউ রেলপথে, কেউ মহাসড়কে, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায়।

রেললাইন ও মহাসড়ক অবরোধ: তৃণমূলের বিক্ষোভে থমকে সীতাকুণ্ড
বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্তত ৩০টি স্থানে বিএনপি কর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। সীতাকুণ্ড ও ভাটিয়ারী এলাকায় রেললাইনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, ফলে চট্টলা এক্সপ্রেসসহ দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন আটকা পড়ে দীর্ঘসময়।

রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আশরাফ ছিদ্দিক বলেন,
“রেললাইনে অগ্নিসংযোগ ও বিক্ষোভের কারণে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরই ট্রেনগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়।”

এই বিক্ষোভের মূল কারণ—আসলাম চৌধুরীকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়া। বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম-৪ আসনে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে।

ত্যাগ, নির্যাতন ও কারাবাস—আসলাম চৌধুরীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস
২০১৬ সালের ১৫ মে রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে গ্রেপ্তার হন আসলাম চৌধুরী। রাষ্ট্রদ্রোহ, মানি লন্ডারিং, অর্থ আত্মসাৎসহ ৭৬টি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়—যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল “মোসাদ এজেন্টের সঙ্গে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র” মামলা।

প্রায় নয় বছর কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি—প্যারোলে মুক্তি পাননি, এমনকি ভাইয়ের মৃত্যুর সময়ও শেষ দেখা হয়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় মুক্তি পান তিনি। কিন্তু মুক্তির পরও দলীয় রাজনীতিতে তাঁকে প্রান্তিক অবস্থায় রাখা হয়।

আসলাম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলেন,
“আসলাম ভাই মাঠের মানুষ, আপোষ করেননি। এই কারণেই তিনি আজ দলের ভেতরেও অবহেলিত। অথচ তৃণমূল আজও তাঁকে ত্যাগী নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা করে।”

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা
দুদকের দায়ের করা সম্পদ বিবরণী মামলাতেও আদালতে বিচার চলছে। আইনজীবীদের দাবি, এসব মামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের অনেকেই বলছেন—“আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁকে সরকারবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে ‘বিরক্তিকর হুমকি’ হিসেবে টার্গেট করা হয়েছিল।”

তৃণমূলের আওয়াজ: “সীতাকুণ্ড মানে আসলাম চৌধুরী”
চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী—সব জায়গার তৃণমূল নেতাকর্মীদের মুখে একটাই কথা:
“আসলাম ভাইয়ের মতো ত্যাগী নেতা চট্টগ্রামে আর নেই।”
“মনোনয়ন না দেওয়া মানে তৃণমূলের আত্মবিশ্বাসে আঘাত।”
“দল সিদ্ধান্ত বদলাবে—এই আশা এখনো ছাড়িনি।”

স্থানীয় এক ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি বলেন,
“নয় বছর কারাবাসের পরও তিনি দলের পতাকা নামাননি। এই মানুষকে বাদ দিলে তৃণমূল কাকে বিশ্বাস করবে?”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
“আসলাম চৌধুরী বিএনপির মাঠের রাজনীতির প্রতীক। তাঁকে উপেক্ষা করা মানে আন্দোলনের ভিত্তি দুর্বল করা।
তিনি শুধু একজন প্রার্থী নন—তিনি আপোষহীন রাজনীতির প্রতিচ্ছবি।”

তাঁদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীতাকুণ্ডে তাঁর প্রভাব এতটাই গভীর যে, তাঁর নাম ছাড়াই ভোটের মাঠ সাজানো কঠিন হবে। দল যদি তৃণমূলের আবেগ অগ্রাহ্য করে, তা ভবিষ্যতে সংগঠনগতভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিএনপি হাই কমান্ডের প্রতি তৃণমূলের বার্তা
চট্টগ্রামের তৃণমূল এখনো দলের প্রতি অনুগত, তবে তাদের দাবি স্পষ্ট—
১. আসলাম চৌধুরীকে সীতাকুণ্ড-৪ আসনে পুনরায় মনোনয়ন দিতে হবে।
২. তাঁর ত্যাগ ও জনপ্রিয়তা বিবেচনায় হাই কমান্ডকে সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
৩. তৃণমূলের কণ্ঠস্বর শুনে যোগ্য নেতাকে মূল্যায়ন করতে হবে।

শেষ কথা: নীরব প্রতিরোধের প্রতীক
দীর্ঘ কারাবাস, নির্যাতন ও উপেক্ষার পরও আসলাম চৌধুরী দল ত্যাগ করেননি।
তিনি আজ বিএনপির ভেতর অনেকের কাছে এক “নীরব প্রতিরোধের প্রতীক”—যিনি ত্যাগের বিনিময়ে রাজনীতির প্রতি আনুগত্যের অর্থ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

একজন স্থানীয় নেতা সংক্ষেপে বললেন—
“তিনি আমাদের মাটির মানুষ, আপোষ করেননি। বিএনপির ইতিহাস লিখলে তাঁর নাম বাদ যাবে না, তা এখন সময়ই প্রমাণ করবে।”

চট্টগ্রামজুড়ে এখন প্রশ্ন একটাই—
ত্যাগী ও জনপ্রিয় আসলাম চৌধুরীকে উপেক্ষা করে কি বিএনপি তৃণমূলের হৃদয় জিততে পারবে?