“জনগণের কল্যাণই রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য, ক্ষমতা নয়”—ব্যারিস্টার পুতুল
জনগণের জীবনমান বৃদ্ধি এবং নির্বাচন-পূর্ব বাস্তবিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নির্বাচনী এলাকায় রাস্তাঘাট, কৃষি, কর্মসংস্থান ও যুবসমাজের সমস্যার সমাধানে ব্যক্তিগত অঙ্গীকার জানিয়েছেন এবং দলের গুণগত পরিবর্তনের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিএনপি চায় গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনঃস্থাপন ও দেশের অর্থনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে সকল রাজনৈতিক দলের সমন্বিত প্রচেষ্টা।
“জনগণের কল্যাণই রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য, ক্ষমতা নয়”—ব্যারিস্টার পুতুল
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন চায় বলে জানিয়েছেন দলের বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটি এবং মানবাধিকার ও মিডিয়া সেলের সদস্য ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। তিনি বলেন, “জনগণের কল্যাণই রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য, ক্ষমতা নয়।”
সাবেক মন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের কন্যা ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বর্তমানে মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে বদ্ধপরিকর। তাদের কাছে উন্নয়ন কেবল কাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং জনগণের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার মানের টেকসই উন্নতি। বিএনপি মনে করে, উন্নয়ন মানে একজন রিকশাচালক যেন প্রতিদিনের আয়ের পরও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারেন, তাঁর সন্তানের জন্য কিছু সঞ্চয় করতে পারেন। এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনমানেরও উন্নতি হওয়াকে নির্দেশ করে।
দলের প্রস্তাবনাগুলো খুবই বাস্তবিক ও প্রয়োগযোগ্য, আকাশকুসুম নয়। তারা মনে করে, দেশকে রাতারাতি সুইজারল্যান্ড বানানো সম্ভব নয়; বরং আগে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দেশকে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং সেই অবস্থানকে টেকসই করতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে আরও উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তাদের প্রধান মনোযোগের জায়গা হলো দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে মজবুত করা, যাতে উন্নতিটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বিএনপি মনে করে, নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশ এগোবে না, কারণ এটি ১৭ বছর ধরে ভোট দিতে না পারা জনগণের দাবি এবং বর্তমান অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ। ফারজানা শারমিন বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি শুধুমাত্র জনগণের দাবি নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক অচলাবস্থা দূর করার জন্যও অপরিহার্য। আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নির্বাচিত সরকার ছাড়া অর্থ ছাড় না করার শর্ত দিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণভোট ইস্যুতে বিএনপি'র অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলটি অযথা গণভোট নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি না করে বরং জুলাই সনদের বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। “নয় মাস ধরে সরকারি অর্থ খরচ করে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করে যে জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে, তার বাইরে গিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক তৈরি করা জাতির সাথে প্রতারণা করার শামিল,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি গণভোটের বিরোধী নয়, তবে তারা চায় জুলাই সনদের বাস্তবায়নই হোক। তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ করেছিল যে, যদি গণভোট হয়, তবে তা সাধারণ নির্বাচনের দিনই হোক। এতে প্রায় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সাধারণ নির্বাচনের স্বল্প সময়ের আগে গণভোটের প্রস্তুতি নেওয়া এবং এর জন্য বিপুল অর্থ খরচ করাকে তিনি ‘অবাস্তব’ ধারণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও শতভাগ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন মত থাকা স্বাভাবিক। ঐক্যমত্য কমিশনের উদ্দেশ্যই ছিল ভিন্ন ভিন্ন মতকে আলোচনার মাধ্যমে একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত জুলাই সনদ হলো সেই ঐক্যের প্রতীক।
বিএনপি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কার কমিশনে সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করছে এবং বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নে ভূমিকা রাখছে। তারা তাদের প্রয়োগযোগ্য প্রস্তাবনাগুলো মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছে। “বিএনপি কোনো ধরনের অস্থির পরিবেশ তৈরি করতে চায় না, কারণ অস্থিরতা সবসময় অপশক্তিকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। আমরা আলোচনার টেবিলে সমস্যা সমাধানের পক্ষে,” বলেন তিনি।
জুলাই সনদ সম্পর্কে ফারজানা শারমিন বলেন, এটি দেশের সব সমস্যার সমাধান নয়, উন্নয়নের বেশিরভাগ কাজ এখনও বাকি আছে। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দুর্নীতির মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে কার্যকর সংস্কারের অভাবের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কোনো কমিশন গঠিত হয়নি। ব্যবসায়িক পরিবেশে কোম্পানি খোলা অত্যন্ত জটিল, যা ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করছে। সিন্ডিকেট ও মনোপলাইজেশনের কারণে ব্যবসায়ীরা সুবিধা করতে পারছেন না। বাস্তবিক প্রয়োগের জায়গায় না এসে শুধু উচ্চাশার কথা বললে তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নিজের নির্বাচনী এলাকা নাটোরের লালপুর-বাগাতিপাড়া নিয়ে ব্যারিস্টার পুতুল বলেন, রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সুগার মিলে আখ মাড়াই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়া আখচাষীদের পুনর্বাসন এবং কৃষকদের সরাসরি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থাই তাঁর অগ্রাধিকারে রয়েছে। এছাড়া মাদকাসক্তি রোধ, তরুণদের হতাশা নিরসন এবং নারীদের জন্য শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই তাঁর লক্ষ্য। তিনি বলেন, “আমি চাই আমার এলাকায় অন্তত একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক, যাতে মানুষকে কাজের জন্য বাইরে যেতে না হয়।”
তিনি আরও বলেন, লালপুর-বাগাতিপাড়াকে তিনি নিজের “ঘর” মনে করেন এবং অঙ্গীকার করেন যে নির্বাচিত হলে তাঁর পুরো জীবন জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ব্যয় করবেন।
দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চায় এবং দলের ইমেজ নষ্টকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ৫ই আগস্টের পর বিএনপি প্রায় সাত হাজার পাঁচশতাধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অন্যায়ের অভিযোগে বহিষ্কার করেছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরল দৃষ্টান্ত। বহিষ্কৃতদের বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অভিযোগ থাকলে দল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছে।
তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেভাবে দেশের বিভিন্ন কোণ থেকে যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ দিয়ে দল গঠন করেছিলেন, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সেভাবেই নতুন প্রজন্মের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করছেন।
ফারজানা শারমিন পুতুল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্র ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সকল রাজনৈতিক দলেরই দ্রুত স্বাভাবিক বোধোদয় হবে এবং তারা নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টা থেকে সরে এসে দেশকে বাঁচানোর জন্য একযোগে কাজ করবে। বিএনপি'র একমাত্র লক্ষ্য হলো দেশকে স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্ত করে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা।
এই মন্তব্যগুলো তিনি করেন আমেরিকান মাল্টিমিডিয়া স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘CSB NEWS USA’-এর বাংলাদেশ প্রধান মোহাম্মদ সাইফুর রহমান-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাৎকারে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা, গণভোট ইস্যু এবং দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন।