জুলাই সনদ, গণভোট ও রাজনৈতিক বিভাজনে বাড়ছে উদ্বেগ
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি নির্বাচনকে ঘিরে ষড়যন্ত্র ও আকস্মিক আক্রমণের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নির্বাচন বানচালের প্রচেষ্টা আসতে পারে যেকোনো সময়।”
জুলাই সনদ, গণভোট ও রাজনৈতিক বিভাজনে বাড়ছে উদ্বেগ
আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে— এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নির্বাচন আদৌ সময়মতো হবে কি না? জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট ইস্যুকে ঘিরে উদ্ভূত মতবিরোধ এখন জাতীয় রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক দল অবস্থান নিচ্ছে, ফলে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ভবিষ্যৎ ঘিরে শঙ্কা বাড়ছে।
গত বছরের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন আশার আলো জ্বেলেছিল। সেই আন্দোলনের ফলেই তৈরি হয় “জুলাই জাতীয় সনদ”— যা নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সেই ঐক্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে।
বিএনপি অভিযোগ করেছে, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় তারা যে “নোট অব ডিসেন্ট” জমা দিয়েছিল, তা চূড়ান্ত সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিএনপির ভাষায়, “এটি রাজনৈতিক প্রতারণা।” অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, তাদের মতামত বাদ দিলে তারা সনদে স্বাক্ষর করবে না।
বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। বিএনপি চায় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হোক, যেখানে জামায়াত চায় নভেম্বরে আলাদা গণভোট। এই অবস্থানগত পার্থক্যই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় “হ্যাঁ বনাম না” প্রচারণায় রূপ নিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের রায়ই চূড়ান্ত হবে। গণভোটেই নির্ধারিত হবে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হবে কি না।”
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, “বাংলাদেশ এখন দুটি নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে পারবে না। অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা সমর্থন দিয়েছি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর, নির্বাহী ক্ষমতার জন্য নয়।”
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বারবার স্বৈরাচারকে সরাই, আবার আমাদের মধ্য থেকেই নতুন স্বৈরাচার জন্ম নেয়।”
অন্যদিকে, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেছেন, “জুলাই সনদের নামে রাজনীতিতে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। এই অবস্থায় নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে হওয়া কঠিন হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “জুলাই সনদ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা সমাধান না হলে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি নির্বাচনকে ঘিরে ষড়যন্ত্র ও আকস্মিক আক্রমণের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নির্বাচন বানচালের প্রচেষ্টা আসতে পারে যেকোনো সময়।”
এদিকে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু গোপন তৎপরতা ও উসকানির খবরও রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম বলেন, “গণভোট ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান উপদেষ্টা নিজেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে আমরা হুমকি হিসেবে দেখছি না। যেটা দেশের জন্য উত্তম হবে, সেটাই করা হবে। তবে নির্বাচন ১৫ ফেব্রুয়ারির আগেই অনুষ্ঠিত হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে। জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের ব্রিফিং, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির কাজ চলছে। তবে রাজনৈতিক অনৈক্য থাকলে এই প্রস্তুতি বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সব রাজনৈতিক দলই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতির সমালোচনায় মুখর, তবে কেউই নির্বাচনের বাইরে থাকতে চায় না। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণও এবার অংশগ্রহণের অপেক্ষায়।
তবে জুলাই সনদ, গণভোটের সময়সূচি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত— সবকিছু এখন নির্ধারণ করবে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সময়মতো হবে কি না।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত মোড়ে— যেখানে গণতন্ত্র, ঐক্য ও বিশ্বাসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর।