রাশিয়া-ইউরোপ জ্বালানি বাণিজ্যে ডলার বাদ, রুবল-ইউয়ানে লেনদেনের নতুন উদ্যোগ শুরু
রাশিয়া-ইউরোপ জ্বালানি বাণিজ্যে ডলার নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ, রুবল ও ইউয়ানে লেনদেন বাড়ানোর নতুন কৌশল মস্কোর।
রাশিয়া-ইউরোপ জ্বালানি বাণিজ্যে ডলার বাদ, রুবল-ইউয়ানে লেনদেনের নতুন উদ্যোগ শুরু
রাশিয়া ও চীনের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্যে রুশ রুবল ও চীনা ইউয়ানের ব্যবহার প্রায় পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হলেও ইউরোপের সঙ্গে সব তেল ও গ্যাস চুক্তিতে মার্কিন ডলার নিষিদ্ধ করে শুধু রুবল বা ইউয়ান ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রাশিয়া ঘোষণা করেছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রুশ জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তা ও রোসনেফতের প্রধান নির্বাহী ইগর সেচিন বলেন, রাশিয়া ও চীনের পারস্পরিক বাণিজ্যিক লেনদেন এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে দুই দেশের নিজস্ব মুদ্রা—রুবল ও ইউয়ানে—সম্পন্ন হচ্ছে। ৪ সেপ্টেম্বর রাশিয়া-চীন জ্বালানি ব্যবসা ফোরামে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে রুবল ও ইউয়ানে লেনদেনের অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
এর আগে মে মাসে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সহকারী ইউরি উশাকভও বলেছিলেন, রাশিয়া ও চীনের প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের কার্যত সব লেনদেন এখন রুবল ও ইউয়ানে হচ্ছে। এর ফলে দুই দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারছে।
রাশিয়ার এই মুদ্রা পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণগুলোর একটি হলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার প্রচলিত ডলার ও ইউরোভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেন কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মস্কো চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
তবে ইউরোপের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি ধীরে ধীরে কমানোর পাশাপাশি রুশ তেল ও গ্যাস খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেছে। জুলাই ২০২৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জ্বালানি, তেল ব্যবসা, এলএনজি এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ওপর নতুন বিধিনিষেধসহ ২১তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ গ্রহণ করে।
তারপরও ইউরোপের কিছু দেশ এখনো রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি করছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের জুলাই ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, ওই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ইউরোর জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে। এর মধ্যে পাইপলাইনের গ্যাস, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং দ্রুজবা পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা অপরিশোধিত তেল ছিল।
অর্থাৎ রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর নীতি অব্যাহত রেখেছে।
রাশিয়া ২০২২ সালেই পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে গ্যাস বাণিজ্যে রুবল ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা করেছিলেন, ‘অবন্ধুত্বপূর্ণ’ দেশগুলোকে রুশ গ্যাসের মূল্য পরিশোধের জন্য রুবলভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ এ ব্যবস্থায় রাজি না হওয়ায় তাদের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় রাশিয়া।
পরবর্তী সময়ে রাশিয়া চীনের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এমনকি রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের কিছু ক্রেতার কাছেও ইউয়ানে অর্থ পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা দেখা গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রুশ তেল বাণিজ্যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর ইউয়ানসহ বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বেড়েছে।
তবে “ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যতের সব তেল ও গ্যাস চুক্তি শুধু রুবল বা ইউয়ানে হবে”—এমন কোনো নতুন সর্বাত্মক রুশ সরকারি ঘোষণা এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত হয়নি। এ ধরনের দাবি নিয়ে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ইউরোপের সব ভবিষ্যৎ জ্বালানি চুক্তিতে ইউয়ান বাধ্যতামূলক করেছে—এমন সরকারি ঘোষণা বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ইউরোপের জন্য “ডলার নিষিদ্ধ” করার নতুন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার চেয়ে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ‘ডলার নির্ভরতা কমানোর’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা বেশি তথ্যসম্মত। রাশিয়া-চীন বাণিজ্যে রুবল ও ইউয়ানের ব্যবহার এখন অত্যন্ত ব্যাপক হলেও ইউরোপের সঙ্গে সব জ্বালানি চুক্তিতে একই নিয়ম কার্যকর হয়েছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই পরিবর্তনের বড় তাৎপর্য হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো। রাশিয়া পশ্চিমা আর্থিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে, আর চীন নিজস্ব মুদ্রার আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য থেকে মার্কিন ডলার ইতিমধ্যে বাদ পড়েছে। বরং বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে রুবল, ইউয়ান এবং অন্যান্য স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ছে।