যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযানে, আগস্টে আইসিইর আটক প্রায় ৫১ হাজারে পৌঁছেছে
যুক্তরাষ্ট্রে আইসিইর আটক বেড়ে আগস্টে প্রায় ৫১ হাজার, গ্রেপ্তার বাড়লেও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি বহিষ্কার, সামনে নতুন চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযানে, আগস্টে আইসিইর আটক প্রায় ৫১ হাজারে পৌঁছেছে
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগের অভিযান সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও জোরালো হয়েছে। নতুন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬-এ দেশটির অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিই প্রায় ৫১ হাজার মানুষকে আটক করেছে, যা টানা তৃতীয় মাসে মাসিক আটকের নতুন উচ্চতা তৈরি করেছে। তবে আটক বাড়লেও একই অনুপাতে বহিষ্কার বাড়েনি। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার সক্ষমতা, আদালতের কার্যক্রম এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রয়টার্সের ১৪ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্টে আইসিইর আটক প্রায় ৫১ হাজারে পৌঁছায়। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশের বেশি আটক ব্যক্তি কোনো অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আটকের সংখ্যা বাড়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি তথ্যভান্ডার থেকে তথ্য সংগ্রহের সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বেশি মানুষ আটক হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের সবাইকে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। বরং আটক ও বহিষ্কারের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বহিষ্কারের হার প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের কাছাকাছি পর্যায়ে স্থির রয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক আটক ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে হেফাজতে রাখা, তাদের মামলা পরিচালনা করা এবং বহিষ্কারের ব্যবস্থা করা—সবকিছুই প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
এর একটি বড় কারণ হলো, অনেক আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধের সাজা নেই। কারও বহিষ্কার আদেশ নেই, কারও আশ্রয়ের আবেদন বিচারাধীন, আবার কেউ গ্রিন কার্ড বা অন্য কোনো বৈধ অভিবাসন সুবিধার আবেদন প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। ফলে কোনো ব্যক্তিকে আটক করা গেলেও তাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে পাঠানো সবসময় আইনগতভাবে সম্ভব হয় না।
অভিবাসন আদালতের কার্যক্রমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বৈধ দাবি করলে তাকে আদালতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। আশ্রয়প্রার্থী বা অন্য কোনো আইনি সুরক্ষার আবেদন বিচারাধীন থাকলে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত ব্যবস্থাও বহিষ্কারের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনো দেশ যদি নাগরিকদের গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক কারণে বিলম্ব করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আদালতের সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো কঠিন হতে পারে। রয়টার্সও বহিষ্কার ফ্লাইটের সক্ষমতা এবং কিছু দেশের নাগরিক গ্রহণসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতাকে এই ব্যবধানের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আইসিইর অভিযান বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন বসবাসরত অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের অভিবাসন-সংক্রান্ত মামলা এখনো শেষ হয়নি, তাদের জন্য নিজেদের কাগজপত্র, আদালতের তারিখ এবং আইনগত অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে শুধু আইসিইর আটকের সংখ্যা দেখে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বহিষ্কারের সম্ভাবনা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। প্রতিটি অভিবাসন মামলা আলাদা। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বহিষ্কার আদেশ আছে কি না, অপরাধের ইতিহাস রয়েছে কি না, আশ্রয়ের আবেদন বিচারাধীন কি না, বৈধ কোনো অভিবাসন আবেদন আছে কি না—এসব বিষয় মামলার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই পরিবার, চাকরি, ব্যবসা ও শিক্ষার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। কারও বৈধ কাগজপত্র থাকলে নিয়মিত নথিপত্র সংরক্ষণ এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সরকারি চিঠিপত্রের প্রতি নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আর যাদের মামলা আদালতে চলমান, তাদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শুনানিতে উপস্থিত থাকা এবং প্রয়োজন হলে অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অভিবাসন নীতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে। তবে ১৪ সেপ্টেম্বর ম্যাসাচুসেটসের একজন ফেডারেল বিচারক বিদেশি শিক্ষার্থী, বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী ও বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থানের মেয়াদ পরিবর্তনের নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে সাময়িক বাধা দিয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিনের ‘অবস্থানের মর্যাদা’ ব্যবস্থা আপাতত বহাল রয়েছে এবং বিষয়টি আদালতে চলমান।
অন্যদিকে, উচ্চ দক্ষতার বিদেশি কর্মীদের জন্যও অভিবাসন ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। প্রশাসন এইচ-১বি ও কয়েকটি অন্যান্য কর্মভিত্তিক ভিসাধারীর চাকরি চলে গেলে প্রচলিত ৬০ দিনের ছাড়ের সময়সীমা বাতিলের প্রস্তাব করেছে। এটি এখনো চূড়ান্ত নিয়ম নয় এবং প্রস্তাবটি নিয়ে মতামত দেওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে।
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে কোনো বিদেশি কর্মী চাকরি হারানোর পর নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজা বা নিজের অভিবাসন অবস্থান ঠিক করার জন্য আগের তুলনায় অনেক কম সময় পেতে পারেন। প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে কর্মরত বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য এ কারণে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা বর্তমানে শুধু সীমান্তে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির ভেতরে থাকা অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগ, তথ্য যাচাই, আটক, আদালত এবং বহিষ্কারের কার্যক্রম একসঙ্গে চলছে।
তবে আটক বাড়লেও বহিষ্কার একই গতিতে না বাড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিবাসন আইনে আটক এবং বহিষ্কার দুটি আলাদা ধাপ। কোনো ব্যক্তিকে আটক করা হলেও তার আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে সবসময় সরাসরি নিজ দেশে পাঠানো যায় না। এ কারণেই আটকের সংখ্যা ও বহিষ্কারের সংখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসন আইসিইর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে আদালত ও বিভিন্ন আইনি সংগঠন অভিবাসন নীতির কয়েকটি পরিবর্তন নিয়ে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা আরও একাধিক আইনি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের অভিবাসন অবস্থার বিষয়ে সরকারি নথি ও নির্ভরযোগ্য আইনগত পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে আদালতের মামলা, আশ্রয়ের আবেদন, কাজের অনুমতি, গ্রিন কার্ড বা অন্য কোনো অভিবাসন আবেদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগের মাত্রা যে বেড়েছে, সে বিষয়ে সাম্প্রতিক তথ্য স্পষ্ট। কিন্তু প্রত্যেক আটক ব্যক্তির ভবিষ্যৎ একই হবে—এমন নয়। আইসিইর আটক, আদালতের সিদ্ধান্ত, ব্যক্তির অভিবাসন অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার ওপর চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে।