লস অ্যাঞ্জেলেসে বাস দুর্ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত তিন

লস অ্যাঞ্জেলেসে বাস দুর্ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের সময় এনবিসি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, সাংবাদিক ও পাইলটসহ তিনজন নিহত, তদন্ত শুরু।

লস অ্যাঞ্জেলেসে বাস দুর্ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত তিন

লস অ্যাঞ্জেলেসে বাস দুর্ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত তিন


লস অ্যাঞ্জেলেসে একটি ভয়াবহ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সংবাদকর্মী ও পাইলটসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্থানীয় একটি বাস দুর্ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের সময় এনবিসি৪ ও টেলিমুন্ডো ৫২-এর জন্য ব্যবহৃত সংবাদ হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাটি ঘটে লস অ্যাঞ্জেলেসের চ্যাটসওর্থ এলাকায়, যা শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। 


দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন হেলিকপ্টারটির অভিজ্ঞ পাইলট জর্জ মার্সিনিউ এবং আকাশপথে সংবাদ ও ছবি সংগ্রহকারী সাংবাদিক এলিয়ানা মোরেনো। ঘটনাস্থলে মাটিতে থাকা আরও একজনও প্রাণ হারিয়েছেন। অন্তত আরও দুজনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে লস অ্যাঞ্জেলেসের দমকল বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 


হেলিকপ্টারটি একটি প্রাণঘাতী বাস দুর্ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের একটি দল ওই দুর্ঘটনার ওপর সরাসরি আকাশপথে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিল। ঠিক কী কারণে হেলিকপ্টারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড এবং ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে। 


প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দুর্ঘটনার পর হেলিকপ্টার থেকে আগুনের শিখা এবং ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। দমকল বিভাগের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। লস অ্যাঞ্জেলেস দমকল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৭০ জনের বেশি দমকলকর্মী উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে অংশ নেন। দুর্ঘটনায় দুটি সংরক্ষণাগার ও চারটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 


দুর্ঘটনাকবলিত হেলিকপ্টারটি ছিল ইউরোকপ্টার এএস৩৫০ মডেলের। ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, হেলিকপ্টারটি ২০০৪ সালে নির্মিত হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর সেটি ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হয়। তদন্তকারীরা এখন হেলিকপ্টারটির রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক অবস্থা, উড্ডয়নের পরিস্থিতি এবং দুর্ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তের তথ্য পরীক্ষা করছেন। 


দুর্ঘটনার আগে হেলিকপ্টারের ভেতর ধারণ করা ভিডিও নিয়েও তদন্তকারীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সিএনএনের বিমান চলাচলবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিওতে ইঞ্জিনের শক্তি কমে যাওয়ার মতো শব্দ এবং সতর্কসংকেত শোনা যায়। প্রধান রোটরের গতি কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্কবার্তাও শোনা গেছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ হিসেবে এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। 


দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এনবিসি৪-এর নিউজরুমেও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। সরাসরি সম্প্রচারের সময় উপস্থাপকরা জানতে পারেন যে তাদের সংবাদ হেলিকপ্টারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কিছুক্ষণ পর দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত হলে সম্প্রচার সাময়িকভাবে অন্য অনুষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়া হয়। সহকর্মীরা নিহত সাংবাদিক ও পাইলটের স্মৃতিচারণ করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। 


নিহত সাংবাদিক এলিয়ানা মোরেনো দীর্ঘদিন ধরে আকাশপথে সংবাদ সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এনবিসি৪-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১০ সালে চ্যাপম্যান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রচার সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন এবং আকাশপথে সংবাদ সংগ্রহে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। 


মোরেনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হেলিকপ্টার থেকে সংবাদ সংগ্রহের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরতেন। অগ্নিকাণ্ড, পুলিশি অভিযান, সড়ক দুর্ঘটনা ও অন্যান্য জরুরি ঘটনার ওপর আকাশ থেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেন তিনি। দর্শকদের কাছে সংবাদ হেলিকপ্টারের প্রতিবেদক হিসেবে তার কণ্ঠ পরিচিত হয়ে উঠেছিল। 


পাইলট জর্জ মার্সিনিউও দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ছিলেন। এনবিসি৪-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি বারব্যাঙ্ক এলাকায় বেড়ে ওঠেন এবং বহু বছর ধরে উড়োজাহাজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মোরেনো ও মার্সিনিউ ২০২৩ সাল থেকে একই সংবাদ হেলিকপ্টার দলের সঙ্গে কাজ করছিলেন। 


লস অ্যাঞ্জেলেসে সংবাদ হেলিকপ্টারের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে গাড়ি ধাওয়া, অগ্নিকাণ্ড, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও পুলিশের অভিযান সরাসরি আকাশ থেকে দেখানোর জন্য স্থানীয় টেলিভিশনগুলো নিয়মিত হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং বড় এলাকার দৃশ্য একসঙ্গে দেখানোর কারণে এসব হেলিকপ্টার স্থানীয় টেলিভিশন সংবাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 


তবে আকাশপথে সংবাদ সংগ্রহের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ব্যস্ত শহরের আকাশসীমায় একাধিক হেলিকপ্টার একই ঘটনার ছবি সংগ্রহ করতে গেলে উড্ডয়ন পরিচালনা জটিল হয়ে উঠতে পারে। অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। ২০০৭ সালে অ্যারিজোনার ফিনিক্সে পুলিশি অভিযানের সংবাদ সংগ্রহের সময় দুটি টেলিভিশন হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছিলেন। এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আকাশপথে একই ঘটনার ছবি ভাগাভাগি করার মতো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। 


চ্যাটসওর্থের এবারের দুর্ঘটনাটি আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে, কারণ হেলিকপ্টারটি যে ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিল, সেই বাস দুর্ঘটনাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। ফলে একই সন্ধ্যায় একটি সড়ক দুর্ঘটনা এবং তার সংবাদ সংগ্রহকারী দলের দুর্ঘটনা—দুটি ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাস ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। 


ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমও নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক প্রকাশ করেছেন। এনবিসি৪ ও টেলিমুন্ডো ৫২ যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত তাদের হেলিকপ্টারটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এবং তারা এই ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত। 


এখন তদন্তকারীদের প্রধান কাজ হলো দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা। হেলিকপ্টারের যান্ত্রিক ত্রুটি, উড্ডয়ন পরিস্থিতি, আবহাওয়া, পাইলটের সিদ্ধান্ত এবং দুর্ঘটনার আগের কয়েক মিনিটের যোগাযোগ—সবকিছুই তদন্তের অংশ হতে পারে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। 


এই দুর্ঘটনা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন সংবাদে ব্যবহৃত হেলিকপ্টারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে ব্যস্ত শহরের আকাশসীমায় দ্রুত সংবাদ সংগ্রহের সময় কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়, সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোচনা হতে পারে।

বর্তমানে জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড ও ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসনের তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হেলিকপ্টারটি কেন বিধ্বস্ত হয়েছিল—এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো কারণ বলা যাচ্ছে না। তবে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে, সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একজন সাংবাদিক, একজন পাইলট এবং মাটিতে থাকা একজন ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর