দলে ‘নাম বিক্রির রাজনীতি’ থামাতে কঠোর বার্তা দিলেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান!
“আমার নাম নিয়ে নির্দেশ চালিয়ে দিয়েন না”—তারেক রহমানের সতর্কবার্তা: বিএনপির ভেতরের বাস্তবতা কী?
দলে ‘নাম বিক্রির রাজনীতি’ থামাতে কঠোর বার্তা দিলেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান!
সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন—"আমার নাম নিয়ে নির্দেশ চালিয়ে দিয়েন না।”
এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর অর্থবহ বক্তব্য এখন পুরো বিএনপিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন—এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ মন্তব্য নয়, বরং বিএনপির ভেতরকার একটি চলমান সমস্যার সরাসরি ইঙ্গিত।
বিএনপির কার্যক্রমে তারেক রহমানের ভূমিকা এখন কার্যত সর্বোচ্চ। নির্বাসনে থেকেও ২০১৮ সাল থেকে তিনি লন্ডন থেকে দলের সাংগঠনিক নির্দেশনা দিচ্ছেন, অনলাইনে নিয়মিত বৈঠক নিচ্ছেন, প্রার্থী নির্ধারণ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের রাজনীতি পর্যন্ত তিনি নজর রাখছেন।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমানের এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দলের কিছু নেতা-কর্মী তার নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ নিজের প্রভাব বাড়াতে বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে “চেয়ারম্যানের নির্দেশ” বা “স্যারের অনুমোদন” বলে চালিয়ে দিচ্ছেন নানা পদক্ষেপ।
বিএনপি বিটের সিনিয়র সাংবাদিক মইনুদ্দিন খান তার বিশ্লেষণে লিখেছেন—
> “তারেক রহমান এই কথা এমনি এমনি বলেননি। তার কাছে নিশ্চিতভাবে এমন ম্যাসেজ পৌঁছেছে যে, দলের অভ্যন্তরে কেউ কেউ তার নাম বিক্রি করে চলছে।”
তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি একটি বিশাল এবং মতবৈচিত্র্যপূর্ণ দল, যেটি দূর থেকে পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। তবু তারেক রহমান সেটি দক্ষতার সাথে করছেন। কিন্তু তার নাম ব্যবহার করে কিছু নেতাকর্মী ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন—যা দলের ভাবমূর্তির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
মইনুদ্দিন খান লিখেছেন—“কিছু ব্যক্তি একসময় স্কাইপে যুক্ত ছিলেন বা কোনো বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বলে নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারেক রহমান দিনে অন্তত দশবার তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এমনকি তার সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো কিছুই হয় না—এমন ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করছেন। এই প্রবণতাই তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল লক্ষ্যবস্তু।”
দলের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ বলছে, ৫ আগস্ট-এর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এই “নাম ব্যবহার প্রবণতা” আরও বেড়েছে। প্রশাসনে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কেউ কেউ তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে পদ-পদবি বাণিজ্য, লোক বসানো, এমনকি অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের বক্তব্য দলের ভেতরে একটি “নৈতিক বার্তা” হিসেবে এসেছে—
> “তার নাম ব্যবহার করে কেউ যেন অনৈতিক বা স্বার্থান্বেষী কাজ না করেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য বিএনপির ভেতরে একধরনের “ক্লিনআপ সিগন্যাল” হিসেবে কাজ করবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই দলে অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু নেতা ‘তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ’ পরিচয়ে সংগঠনের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন।
একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন—“চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে নির্দেশ চালানো বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। এতে দল যেমন বিভক্ত হয়, তেমনি প্রকৃত নেতৃত্বের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্ট যে, তিনি বিএনপির রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চান। তিনি সংগঠনে তরুণ নেতৃত্ব, পেশাজীবী অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ নীতিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মইনুদ্দিন খানের বিশ্লেষণের উপসংহারও তাই—“তারেক রহমান সত্যিকার অর্থেই চান জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করতে। যারা সত্যিকারভাবে তার আদর্শে বিশ্বাসী, তাদের উচিত হবে নাম ব্যবহার না করে, তার চিন্তাধারাকে বাস্তবায়নে সৎভাবে কাজ করা।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এই এক বাক্যের বার্তা—“আমার নাম নিয়ে নির্দেশ চালিয়ে দিয়েন না”—
শুধু দলের ভেতরের কিছু নেতার প্রতি নয়, বরং পুরো সংগঠনের উদ্দেশে দেওয়া একটি সতর্কবার্তা। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, দল পরিচালনায় ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলাই মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।