বিএনপির ‘ভুলে যাওয়া’ সাহসী কণ্ঠ— আসলাম চৈধুরী
মোসাদ-যোগ থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ, ঋণখেলাপি থেকে দুদক মামলা — দীর্ঘ কারাবাস, মামলা আর দলের ভেতর উপেক্ষিত এক আপোষহীন নেতা।
বিএনপির ‘ভুলে যাওয়া’ সাহসী কণ্ঠ— আসলাম চৈধুরী
২০১৬ সালের ১৫ মে রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে রাষ্ট্রদ্রোহ, অর্থ আত্মসাত, মানি লন্ডারিংসহ মোট ৭৬টি মামলায় আসামি করা হয়। সবচেয়ে আলোচিত হয় মোসাদের এজেন্টের সঙ্গে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা।
দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় কারাভোগের পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে মুক্তির পরও দলীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা কার্যত উপেক্ষিত হয়ে পড়ে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনে সক্ষম হন। কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারিবারিক জীবন স্বাভাবিক করতে সক্ষম হলেও আসলাম চৌধুরী দলের “আপোষহীন ধারা”র প্রতিনিধি হিসেবে থেকে যান প্রান্তিক অবস্থানে।
দলীয় একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মুক্তির পর দলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সীমিত রাখা হয়। তিনি যেসব মামলার কারণে বছরের পর বছর কারাগারে ছিলেন, সেগুলোর পেছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পাশাপাশি দলীয় অভ্যন্তরের একটি অংশের ভূমিকাও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে তাঁর ঘনিষ্ঠদের।
তাঁর ঘনিষ্ঠ এক সাবেক নেতা বলেন,
“আসলাম ভাই ছিলেন মাঠের মানুষ, আপোষ করেননি। সেই কারণেই তিনি আজ দলের ভেতরেও অবহেলিত। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সারা দেশে বিএনপির তৃণমূল তাঁকে এখনও একজন ত্যাগী নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা করে।”
সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায়ও আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিচার চলছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এ মামলায় ইতিমধ্যে ৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আদালত আগামী ৪ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
তবে বিএনপি ও স্থানীয় রাজনৈতিক মহল মনে করে, আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে এসব মামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁকে সরকারের জন্য ‘বিরক্তিকর হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়।
২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর দুদকের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। দুদকের দাবি, কারাবন্দি থাকাকালে তাঁকে সম্পদের বিবরণী দাখিলের নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা দেননি।
তবে আসলাম চৌধুরীর আইনজীবীরা বলছেন,
“তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বেশিরভাগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সম্পদ বিবরণী মামলাতেও আইনি প্রক্রিয়া মেনে সময় চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা বিবেচনা করা হয়নি।”
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আসলাম চৌধুরী একসময় ছিলেন বিএনপির সবচেয়ে আলোচিত মুখ। বাণিজ্যিক সফলতা ও সংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি দ্রুত দলীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। কিন্তু মোসাদ-সম্পৃক্ততার বিতর্কের পর তাঁর রাজনৈতিক জীবন এক নাটকীয় মোড় নেয়।
বর্তমানে তিনি মুক্ত হলেও রাজনৈতিকভাবে কার্যত প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে “পুনরায় মাঠে ফেরাতে” আগ্রহ দেখাচ্ছে না, যদিও তৃণমূলের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
“আসলাম চৌধুরীর মতো নেতারা বিএনপির ঐতিহ্যিক আন্দোলন-রাজনীতির প্রতিনিধি। তাঁকে উপেক্ষা করা মানে দলের মাঠের রাজনীতি থেকে এক স্তম্ভ হারানো।”
বিগত এক দশক ধরে একের পর এক মামলা, কারাবাস ও রাজনৈতিক অবহেলার পরও আসলাম চৌধুরী নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। দলের প্রতি আনুগত্য, রাজনৈতিক বিশ্বাস আর ব্যক্তিগত আপোষহীনতার কারণে তিনি এখন অনেকের কাছে এক “নীরব প্রতিরোধের প্রতীক”।