পাকিস্তানে গুলির আতঙ্কে দেশে ফেরার আকুতি, ফেরার আগেই প্রাণ গেল বাংলাদেশি রমজানের
‘গুলি হচ্ছে, আতঙ্কে আছি’ দেশে ফেরার আকুতির মধ্যেই পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ গেল সীতাকুণ্ডের বাংলাদেশি রমজান আলীর।
পাকিস্তানে গুলির আতঙ্কে দেশে ফেরার আকুতি, ফেরার আগেই প্রাণ গেল বাংলাদেশি রমজানের
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাংলাদেশি নাগরিক রমজান আলী। মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে ছোট বোনকে ফোন করে পাকিস্তানের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, কয়েক দিন ধরে এলাকায় থেমে থেমে গোলাগুলি চলছে, তিনি আতঙ্কের মধ্যে আছেন এবং আর সেখানে থাকতে চান না। দেশে ফিরে আসার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফেরার সেই আকুতি পূরণ হওয়ার আগেই সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারালেন তিনি।
নিহত রমজান আলীর বয়স ছিল ৫২ বছর। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের নডালিয়া এলাকায়। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে বসবাস করছিলেন তিনি। বেলুচিস্তানের পিশিন জেলার জিয়ারাত ক্রস এলাকায় একটি কাস্টম হাউসে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন রমজান।
গত ৩১ আগস্ট রাতে জিয়ারাত ক্রস এলাকায় অবস্থিত কাস্টম হাউসে সন্ত্রাসীরা সমন্বিত হামলা চালায়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর পাঁচ সদস্য ও কাস্টমস বিভাগের একজন কর্মকর্তা নিহত হন। হামলার জবাবে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ১০ হামলাকারীকে হত্যা করার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে বেলুচিস্তানের নকচা এলাকায় আরেকটি অভিযানে আরও ১১ হামলাকারী নিহত হয় বলে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
পরিবারের দাবি, কাস্টম হাউসে হামলায় নিহত ছয়জনের একজন ছিলেন রমজান আলী। হামলার পর তাঁর মরদেহ কোয়েটার একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে বলে স্বজনদের জানানো হয়। তবে পাকিস্তানের সরকারি বিবৃতিতে নিহত ব্যক্তিদের জাতীয়তা বা রমজান আলীর পরিচয় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। রমজানের বাংলাদেশি পরিচয় ও ওই ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর তথ্য তাঁর পরিবার এবং পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগেই রমজান তাঁর ছোট বোন মঞ্জুরা বেগমকে ফোন করেছিলেন। ওই ফোনালাপে তিনি পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে নিজের আতঙ্কের কথা জানান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন, সেখানে কয়েক দিন ধরে ভয়ংকর গোলাগুলি হচ্ছে এবং থেমে থেমে গুলি চলছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি আর সেখানে থাকতে চান না। দ্রুত দেশে ফিরে আসার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি।
রমজান শুধু দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলেননি, বাস্তবে দেশে ফেরার প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন। পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশনে দেশে ফেরার জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রমজানকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও প্রক্রিয়াধীন ছিল। এর মধ্যেই তিনি সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজান দীর্ঘদিন পাকিস্তানে থাকার পর শেষ জীবনে দেশে ফিরে নতুনভাবে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। দেশে ফিরে একটি ব্যবসা করার স্বপ্নও ছিল তাঁর। সে জন্য টাকা জমিয়েছিলেন এবং পরিবারের পক্ষ থেকেও তাঁর দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
রমজানের পাকিস্তানে যাওয়া ও সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থানের পেছনেও ছিল দীর্ঘ এক প্রবাসজীবনের গল্প। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৮৯ সালে তিনি পাকিস্তানে যান। এরপর সেখানেই দীর্ঘ সময় কাটান। জীবনের একটি বড় অংশ পাকিস্তানে কাটানোর পর শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হলো না। দেশে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই প্রাণঘাতী হামলার শিকার হন তিনি।
এদিকে রমজান আলীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশন তাঁর মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। হাইকমিশনের পক্ষ থেকে পাকিস্তান সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
রমজানের ভগ্নিপতি কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাঁরা পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে মরদেহ দেশে পাঠানো হবে বলে তাঁদের জানানো হয়েছে।
রমজান আলীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা একজন বাংলাদেশির শেষ স্বপ্নেরও করুণ পরিণতি। যে মানুষটি মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ফোন করে বলেছিলেন, ‘গুলি হচ্ছে, আতঙ্কে আছি, দেশে চলে যাব’—শেষ পর্যন্ত সেই দেশেই আর ফেরা হলো না তাঁর। পাকিস্তানের সহিংসতার মধ্যে প্রাণ হারিয়ে এখন তাঁর অপেক্ষা দেশে ফেরার—তবে জীবিত অবস্থায় নয়, নিথর মরদেহ হয়ে।