দুই কোটি শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা, আরও ৩৫ লাখের লক্ষ্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা

হাম-রুবেলা প্রতিরোধে দুই কোটি শিশু টিকা পেয়েছে, বাদ পড়াদের খুঁজে আগামী এক মাসে আরও ৩৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য।

দুই কোটি শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা, আরও ৩৫ লাখের লক্ষ্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা

দুই কোটি শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা, আরও ৩৫ লাখের লক্ষ্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা


বাংলাদেশে চলমান হাম-রুবেলা সংক্রমণ মোকাবিলায় শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, সরকারের উদ্যোগে ইতোমধ্যে সারা দেশে দুই কোটি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচি থেকে কোনো শিশু বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে আগামী এক মাসে আরও প্রায় ৩৫ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

৭ অক্টোবর হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই হাম প্রতিরোধে সরকার কাজ শুরু করেছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এত বড় সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। 

তবে তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, দুই কোটি সংখ্যাটি হঠাৎ করে একদিনে অর্জিত হয়নি। চলমান জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি কয়েক ধাপে পরিচালিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ শিশু হাম-রুবেলা টিকা পেয়েছিল। ওই সময় কর্মসূচির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশু। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় টিকাদানের সংখ্যা ইতোমধ্যেই বেশি হয়েছিল। 

এর আগে চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে দেশে হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করলে সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ৫ এপ্রিল প্রথম ধাপে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর ১২ এপ্রিল কয়েকটি বড় সিটি করপোরেশন এলাকায় কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হয় এবং পরবর্তী ধাপে সারা দেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ এবং শিশুদের মধ্যে এর জটিলতা গুরুতর হতে পারে। টিকাদানই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। চলতি বছরের সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা পাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়ে। এ কারণেই সরকার নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বিশেষ কর্মসূচি চালু করেছে। 

২৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া নতুন বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যও মূলত বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী এমন শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যারা আগের কর্মসূচিতে টিকা পায়নি বা কোনো কারণে বাদ পড়েছিল। কর্মসূচিটি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। 

শুধু শহরাঞ্চল নয়, প্রত্যন্ত গ্রাম, চর ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় থাকা শিশুদের কাছেও টিকা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, প্রতিবন্ধী শিশু এবং আগের তালিকায় না থাকা শিশুদের শনাক্ত করার জন্য মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। এর ফলে টিকাদানের আওতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন অংশীজন সহযোগিতা করছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সরকার, গ্যাভি, ইউনিসেফ, সিটি করপোরেশন এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন। এত বড় পরিসরে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনায় টিকা সরবরাহের পাশাপাশি পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রশিক্ষিত কর্মী, কেন্দ্র পরিচালনা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানোর সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

এর আগে এপ্রিল মাসে জরুরি কর্মসূচি শুরুর সময় ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির সহায়তায় ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পরে সংক্রমণের পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মসূচি ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত করা হয়। 

তবে টিকাদানের সংখ্যা বাড়লেও স্বাস্থ্যসুরক্ষার ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুদের পূর্ণ টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্য হলেও এখনও কয়েক লাখ শিশু সব প্রয়োজনীয় টিকার সব ডোজ সময়মতো পায় না। বিশেষ করে শহরের বস্তি, প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে থাকা জনগোষ্ঠীর শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। 

তাই বর্তমান বিশেষ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুধু দুই কোটি শিশুর সংখ্যা অর্জন নয়, বরং কোনো শিশু যেন টিকাদানের বাইরে না থাকে তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সচল রাখা, টিকার মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দুই কোটি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনার বক্তব্যের পক্ষে সাম্প্রতিক সরকারি ও সংবাদভিত্তিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে সঠিকভাবে বললে, এটি ২০২৬ সালের বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার হিসাব। এখন সরকারের লক্ষ্য বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে আরও ৩৫ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা এবং হাম প্রতিরোধে টিকাদানের সুরক্ষা আরও বিস্তৃত করা। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর