সেপ্টেম্বরে দেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৮.৫৪ শতাংশ, পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ৮.৫৬ শতাংশ
সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় বাড়লেও আগস্টের তুলনায় কমেছে; প্রবৃদ্ধির পেছনে পোশাকসহ কয়েকটি খাত, তবে এটিকে শুধু সরকারের সাফল্য বলা যাচ্ছে না।
সেপ্টেম্বরে দেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৮.৫৪ শতাংশ, পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ৮.৫৬ শতাংশ
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে সেপ্টেম্বর মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই আয় ছিল প্রায় ৩৬২ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৩১ কোটি মার্কিন ডলার।
সেপ্টেম্বরের এই প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক থেকে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩০৮ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে তৈরি পোশাক থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ২৮৪ কোটি মার্কিন ডলার। নিট পোশাক ও ওভেন পোশাক—দুই উপখাতেই প্রায় সমানভাবে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সেপ্টেম্বরের রপ্তানি ও তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধির হার সত্য হলেও, এই পুরো প্রবৃদ্ধি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের সরাসরি ফল—এমন কোনো নিরপেক্ষ সরকারি পরিসংখ্যান বা গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য মূলত রপ্তানির পরিমাণ, খাতভিত্তিক আয় এবং প্রবৃদ্ধির হিসাব তুলে ধরে; রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে এই প্রবৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে না। তাই সংখ্যাগুলো সত্য হলেও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাটি মতামত হিসেবে উপস্থাপন করাই বেশি তথ্যনির্ভর।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেপ্টেম্বরের প্রবৃদ্ধিকে আগের বছরের একই মাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৪২ কোটি মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে সেপ্টেম্বরের আয় আগস্টের তুলনায় ১১ দশমিক ১১ শতাংশ কমেছে। ফলে শুধু বার্ষিক তুলনায় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলেই রপ্তানি খাতে পূর্ণাঙ্গ ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের হিসাবেও অবশ্য ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০৯ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৭ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কয়েকটি অপ্রধান রপ্তানি খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। হালকা প্রকৌশল পণ্যে বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং গৃহসজ্জার বস্ত্র রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ওষুধ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল আরও উল্লেখযোগ্য—প্রথম তিন মাসে তা ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
রপ্তানি বাজারের দিক থেকেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২৫৯ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্য ও জার্মানিও গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। তুরস্কে রপ্তানি আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে রপ্তানি খাতের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শিল্পকারখানাগুলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বাড়ার পরও শিল্প উদ্যোক্তাদের একাংশ এই পরিসংখ্যান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের বক্তব্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। রপ্তানি আয় বাড়লেও সব ক্ষেত্রে পণ্যের পরিমাণ একই হারে বেড়েছে—এমনটা নিশ্চিত নয়। কাঁচামালের দাম, বিশেষ করে সুতার দাম বাড়ার কারণে পোশাকের একক মূল্যও বেড়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির একটি অংশ বেশি মূল্যের কারণেও হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখনো পুরোপুরি আগের মাত্রায় বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ ফিরিয়ে আনেনি বলেও শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অবশ্য শিল্প ও জ্বালানি পরিস্থিতি উন্নত করার বিষয়ে পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং জ্বালানি সরবরাহ ও শিল্প উৎপাদনের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। একই সময়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকে আলোচনা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের রপ্তানি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। টানা দ্বিতীয় মাসে বার্ষিক হিসাবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হওয়া, তৈরি পোশাকের আয় বৃদ্ধি এবং ওষুধ, পাট, চামড়া ও হালকা প্রকৌশলসহ কয়েকটি খাতের ভালো ফল অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক সংকেত দিচ্ছে। তবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরের রপ্তানি কমে যাওয়া, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা দেখাচ্ছে যে সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই সেপ্টেম্বরের ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে অর্থনীতির ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু এটিকে এককভাবে কোনো রাজনৈতিক সরকারের নীতির ফল হিসেবে চূড়ান্তভাবে দাবি করার মতো তথ্যভিত্তিক প্রমাণ এখনো নেই।