পিচ্চি রাজা পালানোর ঘটনায় দুই পুলিশসহ তিনজন রিমান্ডে, বেরিয়ে আসছে ভয়ংকর তথ্য

কারাগারে নেওয়ার পথে পিচ্চি রাজা পালানোর ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য ও বোনের রিমান্ডে বেরিয়ে আসছে অর্থের বিনিময়ে সহায়তার অভিযোগের তথ্য

পিচ্চি রাজা পালানোর ঘটনায় দুই পুলিশসহ তিনজন রিমান্ডে, বেরিয়ে আসছে ভয়ংকর তথ্য

পিচ্চি রাজা পালানোর ঘটনায় দুই পুলিশসহ তিনজন রিমান্ডে, বেরিয়ে আসছে ভয়ংকর তথ্য


গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়ার পথে আলোচিত আসামি রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’ পালানোর ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার সঙ্গে সহায়তার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই পুলিশ সদস্য ও পিচ্চি রাজার এক বোনকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার গাজীপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক জুবায়ের রশিদ এই আদেশ দেন।


রিমান্ডে নেওয়া তিনজন হলেন কারাগারের আসামিবাহী গাড়ির দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক প্রবীর কুমার বিশ্বাস, গাড়ির চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

পুলিশের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যটি উঠে এসেছে, তা হলো পিচ্চি রাজা গাজীপুরের বাইমাইল এলাকা থেকে পালাননি। ঘটনার পর প্রথম দিকে পুলিশ যে তথ্য দিয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল, কারাগারে ফেরত নেওয়ার সময় বাইমাইল এলাকায় শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে তিনি গাড়ি থেকে বের হন এবং সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরবর্তী তদন্তে সেই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল পাওয়া যায়নি।


তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, পিচ্চি রাজা আসলে ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকায় থাকা অবস্থায় কারাগারের গাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পুলিশ জানিয়েছে, গাড়িটি ওই এলাকায় থামার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গাড়ির চালকের কাছ থেকে চাবি নেন এবং পিচ্চি রাজা ও আরেক বন্দিকে গাড়ির বাইরে নিয়ে আসেন। অন্য বন্দি পরে গাড়িতে ফিরে গেলেও পিচ্চি রাজা আর ফেরেননি। তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি আগে থেকে অপেক্ষমাণ একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে সেখান থেকে চলে যান।


আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার জানিয়েছেন, দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। পালানোর স্থান নিয়েও তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা ছিল। এ কারণে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


তদন্তে আরও জানা গেছে, পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঘটনার প্রকৃত কারণ, কারা কীভাবে সহযোগিতা করেছে এবং এর পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।


পুলিশ জানিয়েছে, গাড়ির চালক নায়েক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এই টাকা পিচ্চি রাজার পালানোর সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, ঠিক কত টাকার বিনিময়ে কাউকে পালাতে সহায়তা করা হয়েছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে অর্থের বিনিময়ে সহযোগিতার অভিযোগ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।


পিচ্চি রাজাকে গত ১৯ মে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ওই এলাকার অন্যতম বড় মাদক কারবারি এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রায় ৩০টি মামলায় অভিযুক্ত। ফলে এমন একজন আসামি কীভাবে পুলিশি পাহারায় থাকা কারাগারের গাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন, তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


ঘটনাটি সামনে আসার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থা। কারাগার থেকে আদালতে নেওয়া এবং আদালত থেকে কারাগারে ফেরত পাঠানোর সময় বন্দিদের নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম থাকার কথা। সেখানে একজন গুরুতর মামলার আসামি কীভাবে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন, তার উত্তর খুঁজছে তদন্ত কমিটি।


আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথমে যে ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছিল এবং পরে তদন্তে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। প্রথম বক্তব্যে পালানোর স্থান হিসেবে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকার কথা বলা হলেও তদন্তে ঢাকার তাঁতীবাজারকে ঘটনাস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিবর্তন তদন্তকারীদের কাছে ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।


পুলিশের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, পিচ্চি রাজার পালানোর পর দায়িত্বে থাকা সদস্যরা ঘটনার প্রকৃত তথ্য গোপন করেছিলেন কি না। যদি এমন অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয়, বরং আসামিকে পালাতে সহায়তার অভিযোগেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

চার দিনের রিমান্ডে এখন তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তকারীরা বিশেষ করে জানতে চাইবেন, পিচ্চি রাজা কীভাবে তাঁতীবাজার এলাকায় গাড়ি থেকে বের হলেন, তার সঙ্গে কার যোগাযোগ ছিল, কে তাকে পরিবহনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল এবং পুলিশের কেউ পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন কি না।

পিচ্চি রাজাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তকারীরা আশা করছেন, রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার পালানোর পুরো ঘটনাটি পরিষ্কার হবে এবং পালাতে সহায়তাকারী অন্য কেউ থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা যাবে।


একজন আলোচিত অপরাধীকে আদালত থেকে কারাগারে ফেরত নেওয়ার সময় এমনভাবে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা ও বন্দি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে তদন্তে পাওয়া তথ্যের পার্থক্য এবং অর্থের বিনিময়ে সহযোগিতার অভিযোগ পুরো ঘটনাটিকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। এখন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে পিচ্চি রাজার পালানোর নেপথ্যের প্রকৃত ঘটনা কতটা প্রকাশ পায়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর