বাংলাদেশেই তৈরি হবে টয়োটার গাড়ি, উৎপাদন শুরু ২০২৯ সালে

জাপানের টয়োটা বাংলাদেশে সংকরচালিত গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, শুরু হবে ২০২৭ সালে, উৎপাদন লক্ষ্য ২০২৯।

বাংলাদেশেই তৈরি হবে টয়োটার গাড়ি, উৎপাদন শুরু ২০২৯ সালে

বাংলাদেশেই তৈরি হবে টয়োটার গাড়ি, উৎপাদন শুরু ২০২৯ সালে


জাপানের বহুজাতিক টয়োটা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান টয়োটা তুশো করপোরেশন বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কার্যালয়ে টয়োটা তুশো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে বাংলাদেশের বাজারে টয়োটার কার্যক্রম সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। 

বৈঠকে টয়োটার পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশে একটি সংকর বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলার কাজ ২০২৭ সালে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে এই শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯ সালের মধ্যে সেখানে পূর্ণমাত্রায় গাড়ি উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। টয়োটা বাংলাদেশের এই উদ্যোগের ভিত্তি হিসেবে ‘বাংলাদেশের সঙ্গে, বাংলাদেশের জন্য’ উন্নয়ন দর্শনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। 

এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশে টয়োটার উপস্থিতি শুধু গাড়ি আমদানি ও বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনমুখী শিল্পে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতদিন বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে টয়োটার পরিচিতি মূলত আমদানি, বিপণন, বিক্রয় ও বিক্রয়োত্তর সেবাকে ঘিরে ছিল। চলতি বছর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে স্থানীয় উৎপাদন পরিকল্পনা দেশের মোটরযান শিল্পের জন্য বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গাড়ি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রাংশ, প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থা, কারিগরি সেবা ও প্রশিক্ষণ খাতেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টয়োটা তুশোর প্রতিনিধিরা বৈঠকে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। তবে কত মানুষের কর্মসংস্থান হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ঘোষণা করা হয়নি। 

বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নেও টয়োটা ভূমিকা রাখতে চায় বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের শিল্পের উপযোগী দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। গাড়ি উৎপাদন শিল্পে দক্ষ প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী, যন্ত্রাংশ বিশেষজ্ঞ, রক্ষণাবেক্ষণকর্মী ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের জনবল প্রয়োজন হয়। ফলে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিল্পখাত উপকৃত হতে পারে। 

একই বৈঠকে টয়োটা বাংলাদেশের দেশব্যাপী বিক্রয় ও সেবা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানায়। দেশের সব বিভাগীয় পর্যায়ে তাদের বিতরণ ও সেবাব্যবস্থা সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে বলে প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছে। এর ফলে রাজধানীর বাইরে টয়োটার গাড়ির বিক্রয়, যন্ত্রাংশ ও বিক্রয়োত্তর সেবা পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ হওয়ার কথা। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টয়োটার বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও তিনি ব্যক্ত করেন। 

বৈঠকে বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। টয়োটা তুশো এসব খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানান। অর্থাৎ গাড়ি উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতেও ভবিষ্যতে জাপানি এই গোষ্ঠীর বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব খাতে বিনিয়োগের কোনো চূড়ান্ত চুক্তি এখনো হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। 

বৈঠকে টয়োটা তুশো করপোরেশনের গতিশীলতা বিভাগের প্রধান নির্বাহী শিগেরু হারাদা, টয়োটা বাংলাদেশ লিমিটেডের সভাপতি প্রেমমিত সিংসহ প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি ও নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে কারখানাটি বাংলাদেশের কোন অর্থনৈতিক অঞ্চলে হবে, মোট কত টাকা বিনিয়োগ করা হবে, বছরে কত গাড়ি উৎপাদন করা হবে কিংবা স্থানীয় যন্ত্রাংশের ব্যবহার কত শতাংশ হবে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অঙ্ক, উৎপাদনক্ষমতা বা বিপুলসংখ্যক চাকরির দাবি ছড়ায়, সেগুলোকে এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পনাটি বাস্তব এবং সরকারি পর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনা। তবে এটি এখনো পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে; ২০২৭ সালে কাজ শুরু এবং ২০২৯ সালে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন এটাই বর্তমানে ঘোষিত লক্ষ্য। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের গাড়ি শিল্পে স্থানীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর