ইয়েমেনে ফের যুদ্ধের আগুন, বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ আশঙ্কা
ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, মোকা দখল ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা। হামলা ও পাল্টা অভিযানে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ।
ইয়েমেনে ফের যুদ্ধের আগুন, বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ আশঙ্কা
ইয়েমেনে আবারও ভয়াবহভাবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় দেশটিতে নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর ধরে তুলনামূলকভাবে স্থবির থাকা হুথি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের মধ্যকার লড়াই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে দ্রুত তীব্র হয়েছে। নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত শুধু ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে ১০ সেপ্টেম্বর। ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোকা দখলে নেওয়ার দাবি করেছে এবং বিভিন্ন সামরিক সূত্রও তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মোকা বাব আল-মানদাব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত একটি কৌশলগত বন্দরনগরী। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত।
মোকা দখলের মধ্য দিয়ে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথি বাহিনী কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকেও অগ্রসর হয়েছে। এর ফলে বাব আল-মানদাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই নৌপথে অস্থিতিশীলতা বাড়লে জাহাজ চলাচল, তেল পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে শুধু স্থলযুদ্ধই নয়, আকাশ ও সমুদ্রপথেও উত্তেজনা বাড়ছে। হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ৭৩ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে সৌদি পক্ষ। অন্যদিকে হুথি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম সৌদি বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার দাবি করেছে। তবে হুথিদের দেওয়া হামলার সংখ্যার সবগুলো দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই থেমে যাওয়ার পর ইয়েমেনে কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি আবার দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে এবং কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিভিন্ন সময়সীমা ও হিসাবের কারণে হতাহতের সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।
ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি এমনিতেই ভয়াবহ। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য সরবরাহ, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করেছে। নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হলে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন। বিশেষ করে শিশু, নারী ও অসুস্থ মানুষদের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মোকা দখলের পর সেখানকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় হুথি যোদ্ধাদের অবস্থান দেখা গেছে, বাজার ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু মানুষ দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকজন চিকিৎসকও নিরাপত্তার কারণে মোকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এই সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানার বাইরেও পৌঁছাতে পারে। বাব আল-মানদাব প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিদের হামলার কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে হুথি হামলার পর বাব আল-মানদাবে নৌযান চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন করে হামলা ও সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলো আবারও এই পথ এড়িয়ে চলতে পারে।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও ব্যাপক উত্তেজনা রয়েছে। ফলে বাব আল-মানদাবে নতুন সংকট তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। ১০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৭ ডলারের ওপরে উঠে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নৌপথে হামলা এবং সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, যখন হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ এই সংঘাত ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। জাতিসংঘের আগের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম আট বছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—মোকা ও লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের অগ্রযাত্রা এবং সৌদি সমর্থিত বাহিনীর পাল্টা সামরিক অভিযান সংঘাতকে আরও বড় আকারে ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে ইয়েমেনে আবারও পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পাশাপাশি বাব আল-মানদাব ও লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মহলে তাই এখন প্রধান উদ্বেগ শুধু ইয়েমেনের সামরিক পরিস্থিতি নয়; বরং নতুন করে লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য ধাক্কা। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ইয়েমেন আরও একবার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।