লোহিত সাগরে সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি হুতিদের
লোহিত সাগরে সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলা, আগুনের ঘটনায় নতুন করে বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
লোহিত সাগরে সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি হুতিদের
লোহিত সাগরে সৌদি আরবের একটি বড় তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী দাবি করেছে, সৌদি আরবের ইয়ানবু উপকূলের কাছে ‘আমজান’ নামের ওই তেলবাহী জাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় বলে জানা গেছে। তবে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন ও হামলাকারী হিসেবে হুতিদের দাবির বিষয়টি এখনো স্বাধীনভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে দাবি করেন, সৌদি আরবের ইয়ানবু উপকূল থেকে কিছু দূরে লোহিত সাগরে আমজান নামের তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। তাঁর দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি জাহাজটিতে আঘাত করে এবং এর ফলে জাহাজের ভেতরে ও মূল ডেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। হুতি গোষ্ঠী আরও দাবি করেছে, হামলার পর ওই এলাকার কয়েকটি জাহাজ সরে যেতে বাধ্য হয়।
তবে হামলার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য কিছুটা ভিন্ন। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা জানিয়েছে, সোমবার ২৪ আগস্ট সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত একটি বস্তু আঘাত হানে। এতে জাহাজটির মূল ডেকে আগুন ধরে যায়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি হামলাকারীর পরিচয় বা ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন নিশ্চিত করেনি।
সৌদি আরবের জাতীয় শিপিং কোম্পানি বাহরিও ঘটনাটির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের মালিকানাধীন জাহাজটি একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘটনার মুখে পড়েছে। জাহাজটির সঙ্গে থাকা সব ক্রু নিরাপদ রয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
‘আমজান’ কোনো ছোট আকারের তেলবাহী জাহাজ নয়। এটি অত্যন্ত বড় আকারের অপরিশোধিত তেল পরিবহনকারী ট্যাংকার। জাহাজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩৩ মিটার এবং এটি প্রায় তিন লাখ টন পর্যন্ত পণ্য বহন করতে সক্ষম। সৌদি আরবের বৃহৎ জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় এ ধরনের জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এমন একটি জাহাজে হামলার ঘটনা সামুদ্রিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হামলার স্থানটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলবন্দর। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কোনো কারণে জাহাজ চলাচলে সমস্যা তৈরি হলে লোহিত সাগর হয়ে তেল পরিবহনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এ কারণে ইয়ানবুর আশপাশে সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা হলে তা শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
লোহিত সাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলো এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে যাতায়াত করে। এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাহাজকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য সরবরাহের সময় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে বিভিন্ন জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে আসছে। গোষ্ঠীটি নিজেদের সামরিক কর্মকাণ্ডকে আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করছে। এর আগে লোহিত সাগর ও আশপাশের সমুদ্রপথে জাহাজে হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলেও বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
এবারের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুতিরা সরাসরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করলেও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদনে শুধু অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতের কথা বলা হয়েছে। তাই জাহাজে হামলার ঘটনা নিশ্চিত হলেও ঠিক কী অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল, সে বিষয়ে আরও স্বাধীন তদন্ত ও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, জাহাজের সব ক্রু নিরাপদ রয়েছেন এবং কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি সামুদ্রিক পরিবেশে বড় ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ার খবরও পাওয়া যায়নি। তবে জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা এবং ভবিষ্যতে এটি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সামগ্রিকভাবে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেলবন্দর ইয়ানবুর কাছে একটি বড় তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। হুতিদের দাবি সত্য হলে এটি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিতে পারে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এখন এই ঘটনার পর সৌদি আরব ও সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং হামলার বিষয়ে তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই নজর থাকবে।