যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরও ইরানের অবস্থান বদলায়নি, পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখেও অনড় ইরান, পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে ওয়াশিংটনের চাপ প্রত্যাখ্যান তেহরানের।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরও ইরানের অবস্থান বদলায়নি, পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও পিছু হটছে না তেহরান। বরং ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। এর আওতায় ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও ভবিষ্যতে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও জাহাজ চলাচল। মার্কিন প্রশাসন এসব ব্যবস্থাকে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার বড় ধরনের অভিযান হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করবে না। ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, দেশটি নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, ইরানেরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার মতো নিজস্ব উপায় রয়েছে।
ইরানের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির নেতৃত্ব মনে করছে চীন ও রাশিয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করবে না। তেহরান আরও আশা করছে, অন্যান্য দেশও ওয়াশিংটনের চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করবে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এর পরিণতি হবে এবং ইরানের হাত বাঁধা নেই।
নতুন নিষেধাজ্ঞার আগে থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা ও হতাশার লক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এসব ব্যবস্থা তেহরানকে পরাজিত করতে পারবে না।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছে। ইরান এর আগে জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি বন্ধসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হলে প্রণালিটির স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধারে তারা সম্মত হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেশটির নেতৃত্বকে নীতিগতভাবে পিছু হটাতে সেগুলো এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হয়নি। নতুন নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও তেহরান বিকল্প বাণিজ্যিক অংশীদার, তেল বিক্রির ব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার বিভিন্ন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে চাইছে।
তবে নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক চাপ যে ইরানের জন্য বড়, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশটির মুদ্রার দর নতুন করে রেকর্ড নিম্নমুখী হয়েছে এবং অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অবকাঠামোগত ক্ষতি ও সংঘাতের চাপের মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চীন ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা। ওয়াশিংটন ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও চাপ বাড়ানোর কথা বললেও চীনের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়নি। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
চীন ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চীনা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলে বেইজিং পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। ফলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশে চীন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারের অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে।
এদিকে কূটনৈতিক সমাধানের পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর আগে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিল।
ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইরান নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অবস্থান বজায় রাখছে এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। একই সময়ে মধ্যস্থতার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টাও চলছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা, ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থানের ওপর।