রাশিয়ার যুদ্ধের ময়দান থেকে অবশেষে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশি তরুণ রাজন হোসেন

চাকরির স্বপ্নে বিদেশ, শেষে যুদ্ধের ময়দান দীর্ঘ লড়াই পেরিয়ে রাজনের দেশে ফেরা যেন এক পরিবারের বুকভরা স্বস্তি।

রাশিয়ার যুদ্ধের ময়দান থেকে অবশেষে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশি তরুণ রাজন হোসেন

রাশিয়ার যুদ্ধের ময়দান থেকে অবশেষে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশি তরুণ রাজন হোসেন


ভালো চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশি তরুণ রাজন হোসেন। দীর্ঘদিন যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকার পর অবশেষে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। কাজের কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানোর পর ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা বাংলাদেশি ৩০ তরুণের মধ্যে রাজন একজন। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের ময়দান থেকে বের হয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন এই তরুণ।

মস্কোর স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজন হোসেনকে দেশে ফেরার বিমানে তুলে দেওয়া হয়। রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাজনের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন হওয়ার পর তার প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা হয়। উদ্ধার হওয়ার পর দেশে ফেরার পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে।

দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, রাজন হোসেন ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে রাশিয়া থেকে আদ্দিস আবাবা হয়ে বাংলাদেশে ফিরছেন। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী রোববার বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার পৌঁছানোর কথা রয়েছে। দীর্ঘদিন পর দেশের মাটিতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

রাজনের রাশিয়ায় যাওয়ার গল্পটিও বেশ বেদনাদায়ক। অন্য অনেক তরুণের মতো তিনিও চাকরি ও ভালো আয়ের আশায় বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির পরিবর্তে তাকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং পরে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে রাজন একপর্যায়ে আহতও হন।

রাজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রাজন অন দ্য গো-বাংলা’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে তিনি যুদ্ধের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন। এসব পোস্টের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে তার অবস্থান ও অভিজ্ঞতার কিছু চিত্রও সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি যুদ্ধের ময়দান থেকে বের হয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা সফল হয়েছে এবং তিনি এখন বাংলাদেশের পথে।

রাজনের ঘটনা সামনে আসার পাশাপাশি রাশিয়ায় প্রতারণার শিকার হওয়া আরও বাংলাদেশি তরুণদের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চাকরির আশ্বাসে রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ বাংলাদেশি তরুণকে পরে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হয়। তাদের অনেকেই যুদ্ধ করার জন্য রাশিয়ায় যাননি; বরং পরিবারের আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের আশায় বিদেশে চাকরি করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু চাকরির পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগে তাদের পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

এই ৩০ তরুণের বিষয়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, তাদের মধ্যে চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গত জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। ফলে রাজনের মতো বাকি তরুণদের নিরাপত্তা নিয়েও তাদের পরিবারের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। যারা এখনো জীবিত আছেন, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে।

এই ঘটনায় বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগও সামনে এসেছে। উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের রাশিয়ায় পাঠানোর সঙ্গে জড়িত তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাদের লাইসেন্স বাতিল এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করার কথাও জানানো হয়েছে। এতে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার ঝুঁকি এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

রাজনকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স থেকে শুরু করে প্রত্যাবাসনের পুরো প্রক্রিয়া দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে। যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে একজন বাংলাদেশি তরুণকে নিরাপদে বের করে দেশে ফেরানো তার পরিবারের জন্য নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর।

তবে রাজনের দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাশিয়ায় এখনো এমন আরও বাংলাদেশি তরুণের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মধ্যে কারও অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রে, কারও অবস্থান সম্পর্কে পরিবার নিশ্চিত নয়। তাই রাজনের প্রত্যাবাসনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও বাকি বাংলাদেশিদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

রাজনের ঘটনা বিদেশে চাকরির স্বপ্ন দেখা তরুণদের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, চাকরির ধরন, চুক্তিপত্র এবং রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা যাচাই করা কতটা জরুরি, এই ঘটনা তা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে। কারণ একটি ভালো চাকরির আশায় বিদেশে গিয়ে যদি কেউ যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আটকে পড়েন, তাহলে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে।

দীর্ঘ অপেক্ষা, ভয়, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং আহত হওয়ার পর অবশেষে রাজন হোসেন দেশের পথে। তার ফিরে আসা যেমন একটি পরিবারের জন্য স্বস্তির খবর, তেমনি রাশিয়ায় আটকে থাকা অন্য বাংলাদেশি তরুণদের জন্যও আশার বার্তা। এখন সবার প্রত্যাশা, রাজনের মতো অন্য তরুণদেরও দ্রুত যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে বের করে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর