ইরানের তরুণদের আড্ডার জায়গা, ক্যাফেগুলোতেই এখন সরকারের চোখে হুমকি

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের পুলিশ নারীকে প্রকাশ্যে হিজাব পরার বাধ্যতামূলক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ডজন ডজন ক্যাফে বন্ধ করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে জনপরিসরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা

ইরানের তরুণদের আড্ডার জায়গা, ক্যাফেগুলোতেই এখন সরকারের চোখে হুমকি

ইরানের তরুণদের আড্ডার জায়গা, ক্যাফেগুলোতেই এখন সরকারের চোখে হুমকি


সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের পুলিশ নারীকে প্রকাশ্যে হিজাব পরার বাধ্যতামূলক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ডজন ডজন ক্যাফে বন্ধ করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে জনপরিসরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির মধ্যেও ইরানের তরুণরা এমন একটি বিলাসিতা ধরে রেখেছিল, যা তাদের অস্বাভাবিক সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনুভূতি দিত—বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত ক্যাফেতে যাওয়া।

দেশটির বিভিন্ন শহরে তরুণরা ক্যাফেতে ভিড় করেন এবং অনেক সময় ফুটপাতেও বসে আড্ডা দেন। তারা গল্প করেন, সিগারেট খান, প্রেম করেন এবং উপভোগ করেন এমন কিছু বিনোদন, যা এখনো তাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে। নারী-পুরুষের এ ধরনের মেলামেশা—যেখানে নারীরা অনেক সময় হিজাব ছাড়াই থাকেন এবং কিছু গ্রাহক গোপনে মদও পান করেন—ইরানে নিষিদ্ধ হলেও এখন তা এক ধরনের দৃশ্যমান পাল্টা-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের নজরও এড়ায়নি বিষয়টি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পুলিশ দেশজুড়ে ডজন ডজন ক্যাফে বন্ধ করে দিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে ইরানের বাধ্যতামূলক হিজাব আইন মেনে না চলার কথা বলা হয়েছে।

ক্যাফের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ ও বুটিকসহ অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও অভিযানের আওতায় এসেছে বলে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে জানা গেছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান পরে আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক পরিবেশ সরকারের জনপরিসরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ করছে। জানুয়ারিতে দেশজুড়ে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়ার পর সরকার জনসমাবেশের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধেরও এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ইরানি সরকার রাতে সরকারপন্থী সমাবেশ আয়োজন করছে। এর মাধ্যমে একদিকে সরকারের প্রতি জনসমর্থনের একটি চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিক্ষোভ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ক্যাফে হয়ে উঠছে নজরদারির কেন্দ্র

তেহরানের ক্যাফে মালিক, কর্মী ও গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাশাপাশি অবস্থিত ক্যাফেগুলো বিশেষভাবে কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জায়গা ছোট হওয়ায় অনেক সময় গ্রাহকরা বাইরে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন। ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছোট ছোট জমায়েত তৈরি হয়, যা কর্তৃপক্ষ সন্দেহের চোখে দেখছে।

তেহরানের এক ক্যাফে মালিক ৪৫ বছর বয়সী আমির বলেন, মনে হচ্ছে যুদ্ধ-পরবর্তী এমন একটি ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযান শুরু হয়েছে, যেখানে সমাজ অসন্তুষ্ট ও চাপে রয়েছে।

তিনি জানান, সর্বশেষ দফায় তার ক্যাফে বন্ধ হয়নি, তবে এর আগেও একবার বন্ধ করা হয়েছিল। তার ভাষায়, তারা সবসময় নিজেদের সান্ত্বনা দেন যে এটি হয়তো সাময়িক একটি ঢেউ—কর্তৃপক্ষ আসে, ক্যাফে বন্ধ করে দেয়, কিন্তু তারা আবারও ফিরে আসেন।

ইরান সরকারের প্রতিশোধের আশঙ্কায় এই প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজনকে শুধু প্রথম নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী শিল্পী মোনা বলেন, বিকেলে ক্যাফের বাইরে যে ভিড় হয়, সেটিই অনেক সময় ক্যাফে বন্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তার মতে, কর্মকর্তারা হয়তো এসব জমায়েতকে কোনো ধরনের প্রতিবাদ মনে করছেন। অথচ বাস্তবে সেখানে তরুণ নারী-পুরুষদের একটি দল শুধু একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছে।

হিজাব আইনই প্রধান কারণ?

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘন, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন না মানা, ‘সামাজিক ও নৈতিক অসদাচরণ’, ‘ইসলামি মূল্যবোধ মেনে না চলা’ এবং ‘প্রচলিত সামাজিক রীতি ভঙ্গ’।

বাস্তবে ক্যাফেগুলোর অনেক কর্মকাণ্ডই সরকারের নির্ধারিত সামাজিক নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তেহরানের তিন বাসিন্দা, যাদের একজন ক্যাফে মালিক, জানান যে মধ্য তেহরানের অনেক ক্যাফে গোপনে বিয়ার পরিবেশন করার জন্য পরিচিত। ইরানে মদ্যপান শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এর জন্য বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে।

কানাডায় বসবাসকারী লেখক ও গবেষক হালেহ মির মিরি ইরানের ক্যাফে সংস্কৃতি নিয়ে একটি বই লিখেছেন। তার মতে, ক্যাফে সংস্কৃতি একদিকে পরিবার ও সমাজের নানা বিধিনিষেধ থেকে সাময়িক মুক্তির সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে এটি সরকারের আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের প্রত্যাখ্যানও প্রকাশ করে।

তার মতে, ক্যাফে সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষ ভিন্নভাবে জীবনযাপন ও নিজেদের পরিচয় নির্মাণের কল্পনা করতে পারে। মানুষের জীবনকে একরকম করে তুলতে অভ্যস্ত একটি সর্বগ্রাসী সরকারের কাছে বিষয়টি স্বভাবতই বিপজ্জনক।

চার বছর ধরে বদলে যাচ্ছে ইরানের সমাজ

ক্যাফে বন্ধ করে এই সংস্কৃতি দমন করার চেষ্টা হলেও গত চার বছরে ইরানি সমাজে যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, তা থামাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে।

২০২২ সালের গ্রীষ্মে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সরকার বাধ্যতামূলক হিজাব আইন না মানা নারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংসভাবে অনেক নারীকে আটক করে।

সে সময় ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনি নৈতিকতা পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর হেফাজতে মারা যান।

তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন নামে পরিচিতি পায়। কয়েক মাস ধরে চলা এই আন্দোলন ইরানকে নাড়িয়ে দেয় এবং দেশটির বহু নারীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

এর পর থেকে প্রকাশ্যে নারীদের চুল খোলা রাখা এবং এমনকি আঁটসাঁট ও শরীর প্রদর্শনকারী পোশাক পরার ঘটনাও অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

ব্যক্তিগতভাবে নারীদের গ্রেপ্তার না করে ব্যবসায় চাপ

বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন সরকার এখন পর্যন্ত হিজাব না পরার অভিযোগে ব্যক্তিগতভাবে নারীদের ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার করা থেকে অনেকাংশে বিরত রয়েছে।

কর্মকর্তারাও বলেছেন, পুরোপুরি কঠোরভাবে হিজাব আইন প্রয়োগ করা হলে নতুন করে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

এর পরিবর্তে সরকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে হিজাব আইন বাস্তবায়নে বাধ্য করছে এবং যারা তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার আইনজীবী ওমিদ শামস বলেন, সরকার সময় সময় মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চায় যে হিজাব এখনো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ ও কট্টরপন্থী রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকেও সরকারের ওপর চাপ রয়েছে।

ক্যাফে বন্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব

ক্যাফে মালিক ও কর্মীদের মতে, সামাজিক পরিবর্তনের বাস্তবতায় এসব বন্ধের অভিযান হয়তো দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ক্ষতি ব্যাপক।

ক্যাফে বন্ধ হলে চাকরির সীমিত সুযোগ থাকা তরুণরা আয় হারান। ব্যবসা বন্ধ থাকলেও ভাড়া ও অন্যান্য খরচ চলতে থাকে। একই সঙ্গে কফি রোস্টার ও অন্যান্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও ক্ষতির মুখে পড়ে।

তেহরানের একজন বারিস্তা রেজা বলেন, তরুণরা আগে অন্তত মনে করতেন যে অন্য কোথাও চাকরি না পেলেও ক্যাফেতে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এখন সেই সুযোগটিও হারিয়ে যাচ্ছে।

শিল্পী মোনা বলেন, প্রতিটি ক্যাফে বন্ধ হওয়ার খবর তাকে ‘হতাশা’র অনুভূতি দেয়। তার মতে, সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কখনো বন্ধ করবে না—এমন একটি অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।

তার ভাষায়, মনে হয়—“তাহলে কি পরিস্থিতি কখনো ভালো হবে না? কখনো কি স্বাভাবিক হবে না?”

সূত্র: The New York Times

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর