ইরানে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কঠোরভাবে চালুর দাবি
ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব কঠোরভাবে কার্যকরের দাবি রক্ষণশীল নেতা ও কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের, বাড়ছে সামাজিক চাপ।
ইরানে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কঠোরভাবে চালুর দাবি
ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। দেশটির রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা, কট্টরপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও কয়েকজন রাজনীতিক প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি নারীদের পোশাকসংক্রান্ত আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সময়ে অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব না পরার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বাধ্যতামূলক পোশাকবিধির বিরুদ্ধে অবস্থান অব্যাহত রেখেছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিভিন্ন শহরে হিজাববিধি না মানার অভিযোগে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপকে সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি রক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ইরানের কট্টরপন্থী মহল বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের অভিযোগ, বর্তমান সরকার ২০২৪ সালে অনুমোদিত আরও কঠোর হিজাব আইনের বাস্তবায়ন স্থগিত রেখে নারীদের পোশাকবিধি লঙ্ঘনের সুযোগ দিচ্ছে। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-তাকি নাকদালি এ বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন।
এদিকে কট্টরপন্থী দৈনিক কেইহান-এর সম্পাদক হোসেইন শারিয়াতমাদারি বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কার্যকরের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আইন অমান্যকারী নারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলেছেন।
তবে সরকার একই সঙ্গে বড় ধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও করছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বাধ্যতামূলক হিজাব ও নারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। ফলে নতুন করে ব্যাপক কঠোর অভিযান শুরু করলে আবারও বিক্ষোভের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালে অনুমোদিত নতুন হিজাব আইনের বাস্তবায়ন পরে স্থগিত রাখা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাবের পুরোনো আইন বাতিল হয়েছে। বিদ্যমান আইন এখনো কার্যকর রয়েছে, যদিও বিভিন্ন সময়ে এর প্রয়োগের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন শহরে অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব ছাড়া চলাফেরা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতেও এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এর বিপরীতে কট্টরপন্থীরা এটিকে রাষ্ট্রের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি করছেন।
তবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অতীতে বাধ্যতামূলকভাবে মানুষের আচরণ পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল অবস্থান হলো, মানুষের বিশ্বাস ও আচরণ জোর করে পরিবর্তন করা সম্ভব নয় এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বিষয়টি সামাজিকভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
এদিকে ইরানের বিচার বিভাগও ‘নৈতিক নিরাপত্তা’ জোরদারে নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তেহরানে নৈতিকতা ও সামাজিক আচরণসংক্রান্ত অভিযোগ দেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার খবর এসেছে। হিজাব না মানার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু কর্মকাণ্ডও এর আওতায় আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একদিকে রক্ষণশীলরা কঠোর প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বহু নারী প্রকাশ্যে আগের বিধিনিষেধ অমান্য করছেন। ফলে সরকারকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি সম্ভাব্য সামাজিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হচ্ছে।