ভারতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে চাপ: কেন তারেক রহমানের ভারত সফর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, খাদ্য আমদানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো সরাসরি জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত

ভারতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে চাপ: কেন তারেক রহমানের ভারত সফর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ

ভারতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে চাপ: কেন তারেক রহমানের ভারত সফর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ



বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, খাদ্য আমদানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো সরাসরি জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। 

৩০–৬০–৯০ দিনের স্ট্রেস-টেস্টে স্পষ্ট, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, খাদ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা; তাই সম্ভাব্য ভারত সফরকে শুধু কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের অস্থিরতার মধ্যে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুতে ভারতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা গত কয়েক বছরে বেড়েছে। রয়টার্সের জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ভারতীয় বিদ্যুৎ বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১৫.৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, যেখানে ২০২৪ সালে এই অংশ ছিল প্রায় ১২ শতাংশ।

এর মধ্যে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভারতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি জাতীয় গ্রিডে চাপ বাড়াতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত বিদ্যুৎ বন্ধ করলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বাংলাদেশ নিজস্ব গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি এবং অন্যান্য উৎস ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু বিকল্প উৎপাদন বাড়াতে গেলে জ্বালানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ দুটোই বাড়বে।

ডিজেল: সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো ডিজেল।

মার্চে রয়টার্স জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হলে বাংলাদেশ ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ডিজেল সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিল। সে সময় ঢাকার হাতে প্রায় এক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছিল।

ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এর ফলে ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে সরাসরি বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।

ফলে ভারতীয় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে বাংলাদেশকে দূরবর্তী বাজার থেকে বেশি খরচে জ্বালানি আমদানি করতে হতে পারে।

৩০ দিনের স্ট্রেস-টেস্ট: সংকট, কিন্তু সামলানো সম্ভব

যদি ভারত হঠাৎ বিদ্যুৎ ও ডিজেল সরবরাহ অর্ধেক বা পুরোপুরি কমিয়ে দেয়, প্রথম ৩০ দিনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি।

সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে:

লোডশেডিং বৃদ্ধি;

শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া;

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি;

ডিজেলচালিত কৃষি ও সেচে চাপ;

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি;

পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি।

তবে খাদ্যক্ষেত্রে প্রথম ৩০ দিনে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকার সম্ভাবনা বেশি। জুনে বাংলাদেশের সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২০ লাখ টনের বেশি।

অর্থাৎ ভারতীয় খাদ্য সরবরাহ কমে গেলেই এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশে খাদ্য শেষ হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কার ভিত্তি নেই।

৬০ দিনে সংকট অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে

৬০ দিনের মধ্যে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি তরল জ্বালানি ব্যবহার করতে হলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানির জন্য বেশি ডলার প্রয়োজন হবে।

তখন একটি চক্রাকার চাপ তৈরি হতে পারে:

জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি → ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি → আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি → মূল্যস্ফীতি → শিল্প উৎপাদন ব্যাহত → রপ্তানি আয় কমার ঝুঁকি।

বিশেষ করে পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিমেন্ট, সিরামিকসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-নির্ভর শিল্পগুলো দ্রুত চাপের মুখে পড়তে পারে।

৯০ দিনে ঝুঁকি আরও গভীর

৯০ দিনের দীর্ঘস্থায়ী supply shock-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ঘাটতি নয়; বরং জ্বালানি, বৈদেশিক মুদ্রা এবং খাদ্যের দামের ওপর একই সময়ে চাপ।

বাংলাদেশের গম আমদানির প্রয়োজনও উল্লেখযোগ্য। মার্কিন কৃষি বিভাগের ২০২৫/২৬ সালের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের গম আমদানি প্রায় ৭.৪ মিলিয়ন টন হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ফলে ভারতীয় সরবরাহের পাশাপাশি যদি কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল বা মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়, বাংলাদেশের খাদ্য আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়তে পারে।

কেন তারেক রহমানের ভারত সফর জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ?

এই বাস্তবতায় সম্ভাব্য ভারত সফরকে শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য সফর হিসেবে দেখা হলে বিষয়টির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আড়াল হয়ে যাবে।

প্রথমত—জ্বালানি নিরাপত্তা

বাংলাদেশের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক স্বার্থ হলো নিশ্চিত ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ। ভারতীয় সরবরাহ অব্যাহত রাখা, দীর্ঘমেয়াদি ডিজেল চুক্তি, পাইপলাইন ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা সফরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত—বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা

ভারতীয় বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাই বিদ্যুৎ আমদানির দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা, মূল্য নির্ধারণ এবং বকেয়া পরিশোধের কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা বাংলাদেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত—খাদ্য নিরাপত্তা

চাল, গম, পেঁয়াজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের নিকটবর্তী একটি বড় সরবরাহকারী। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থির থাকলে ভারত থেকে দ্রুত খাদ্য আমদানির সুযোগ বাংলাদেশের জন্য একটি strategic buffer হিসেবে কাজ করতে পারে।

চতুর্থত—বাণিজ্য ও সরবরাহ-শৃঙ্খল

ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে পণ্য পরিবহন, স্থলবন্দর, কাস্টমস এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য ব্যয় বাড়তে পারে।

পঞ্চমত—কূটনৈতিক leverage কমানো

বাংলাদেশ যদি একদিকে ভারতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সম্পর্ক ক্রমাগত অবনতি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে economic interdependence রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

তাই তারেক রহমানের সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা, কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাতিষ্ঠানিক ও চুক্তিভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষিত করা।

তবে সফর মানেই ছাড় দেওয়া নয়

জাতীয় স্বার্থে ভারত সফরের পক্ষে যুক্তি থাকার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে সব বিষয়ে ভারতের অবস্থান মেনে নিতে হবে।

বরং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে:

“সহযোগিতা বাড়ানো, কিন্তু নির্ভরতা কমানো।”

অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে:

LNG ও জ্বালানির উৎস বহুমুখী করতে হবে;

বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে;

খাদ্য আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে;

কৌশলগত fuel reserve বাড়াতে হবে;

ভারত ছাড়া বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করতে হবে;

চীন, মধ্যপ্রাচ্য, ASEAN ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে energy diplomacy জোরদার করতে হবে।

৩০/৬০/৯০ দিনের এই stress test একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ভারত বাংলাদেশের একমাত্র জীবনরেখা নয়, কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতকে উপেক্ষা করার মতো অবস্থাতেও বাংলাদেশ নেই।

ভারতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাংলাদেশের power mix-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ; জ্বালানি আমদানিতে ভারত একটি দ্রুততম বিকল্প উৎস; আর খাদ্য আমদানিতে ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারতের গুরুত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—বাজার, বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগের কারণে।

সুতরাং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে “ভারতের কাছে যাওয়ার সফর” নয়, বরং “বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য উচ্চপর্যায়ের দরকষাকষির সুযোগ” হিসেবে দেখা যেতে পারে।

মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ককে রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে বের করে একটি স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য এবং পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোয় নিয়ে আসা।

বিশ্লেষন : এস গোস্বামী, সিএসবি নিউজ, ইউএসএ।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর