‘হ্যাঁ’ ভোট প্রচারে ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগে সরকারকে আইনি নোটিশ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (CSR) তহবিল এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে
‘হ্যাঁ’ ভোট প্রচারে ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগে সরকারকে আইনি নোটিশ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (CSR) তহবিল এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আইনজীবী আসলাম মিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরী এই নোটিশ প্রদান করেন। এতে দাবি করা হয়, ব্যাংক ও ব্যাংকার্স সংগঠন ABB থেকে প্রায় ৩.৭ কোটি টাকা এবং ছয়টি মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে প্রায় ১৪২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায়।
বিশ্লেষণমূলকভাবে দেখলে, অভিযোগটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—এই অর্থ ব্যয় কি বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার মধ্যে বৈধভাবে করা হয়েছে, নাকি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের CSR নীতিমালায় সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়ন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সেই কাঠামোর বাইরে গিয়ে যদি রাজনৈতিক বা নির্বাচনী প্রচারণায় তহবিল ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তবে তা নীতিগত লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে এই পর্যায়ে এটি শুধু অভিযোগ, কারণ অর্থের প্রকৃত ব্যবহার ও অনুমোদন প্রক্রিয়া যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১১ জানুয়ারির একটি ব্যাংকার্স সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের উপস্থিতিতে এই তহবিল সংক্রান্ত আলোচনা হয় এবং পরবর্তীতে ABB-কে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত বা নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যদি এ ধরনের নির্দেশ লিখিত নীতিগত অনুমোদন ছাড়া হয়ে থাকে, তবে তা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে। তবে শুধুমাত্র সভার আলোচনা বা অংশগ্রহণই আইন ভঙ্গের প্রমাণ নয়; এর জন্য অফিসিয়াল মিনিটস, নির্দেশনা ও আর্থিক নথি প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো একটি ফাউন্ডেশন বা সংগঠন, যা শুরুতে নিবন্ধিত ছিল না, পরে দ্রুত নিবন্ধন পেয়ে অর্থ গ্রহণ করে এবং পরে তাদের কার্যক্রমে পর্যাপ্ত অফিস বা ব্যয়ের নথি পাওয়া যায়নি। যদি এই তথ্য সঠিক হয়, তবে এটি NGO নিবন্ধন প্রক্রিয়া, সরকারি তহবিল বিতরণ এবং অডিট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যা দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের আওতায় যেতে পারে। তবে এখানেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ১৪২ কোটি টাকা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি প্রচারণায় ব্যয় করা হয়েছে। আইনি ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার বৈধ হতে হলে তা বাজেট অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ এবং আইনগত কাঠামোর মধ্যে থাকতে হয়। যদি এটি তথ্য প্রচার বা গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতা কার্যক্রম হয়, তাহলে তা বৈধ হতে পারে; কিন্তু যদি এটি একপক্ষীয় রাজনৈতিক ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তবে তা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সার্বিকভাবে, এই নোটিশটি একটি প্রি-লিটিগেশন বা মামলা পূর্ববর্তী আইনি সতর্কতা, যার ভিত্তিতে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। তবে বর্তমান অবস্থায় কোনো অভিযোগই আদালত বা নিরপেক্ষ তদন্ত দ্বারা প্রমাণিত নয়। ফলে এটিকে চূড়ান্ত দুর্নীতির সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যার সত্যতা নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও বিচারিক তদন্ত প্রয়োজন।