বাংলাদেশে বাস্তব সমাজের পাশাপাশি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে ভার্চুয়াল সমাজ, আর এই ডিজিটাল পরিসরেই এখন নতুন এক সামাজিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘ফটো কাট মহামারী’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত ছবি, ভুয়া তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ আইসিটি অ্যালায়েন্সের আয়োজনে “সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধ” বিষয়ক এক আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—কেউই এখন এই অপপ্রচার থেকে নিরাপদ নয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট রেজাউল করিম রনি বলেন, করোনা মহামারীর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত ছবি ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়েও বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা একটি সুস্থ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের জন্য হুমকি।
তিনি বলেন, বর্তমানে গুজব ও ভুয়া কনটেন্ট তৈরির একটি সংগঠিত চক্র সক্রিয় রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের ফলে গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। সমালোচনা করা নাগরিকের অধিকার, তবে তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালি বা মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে না হয়। গণতান্ত্রিক সমাজে কী বলা যাবে, তার পাশাপাশি কী বলা উচিত নয়—এই সীমারেখা সম্পর্কে সচেতনতা থাকা প্রয়োজন বলেও তারা মত দেন।
আলোচনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে একটি বিশেষায়িত ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি ফোর্স’ গঠনের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, পর্যটন পুলিশ বা বাণিজ্য পুলিশের মতো ডিজিটাল মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে একটি আলাদা কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
এছাড়া, নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও উল্লেখ করা হয়। বিকৃত ছবি, ভুয়া তথ্য ও চরিত্রহননের মাধ্যমে তাদের টার্গেট করা হচ্ছে, যা ভার্চুয়াল সমাজের পাশাপাশি বাস্তব সমাজেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, বট আইডি ও সংগঠিত অপপ্রচার চক্রকে প্রতিরোধ করা না গেলে সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই গুজব প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার জন্য সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তারা মনে করেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইনি কাঠামোই নয়, বরং দায়িত্বশীল ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।