রূপপুর প্রকল্প: বঙ্গবন্ধুর প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তিকে শেখ হাসিনার বাস্তবায়ন এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সকল দলের নৈতিক ঐক্যের ফল

পাকিস্তান সরকার রূপপুর প্রকল্পের চেয়ে করাচি প্রকল্পকে অধিক গুরুত্ব দেয়। ফলে রূপপুরের জন্য প্রস্তাবিত কারিগরি সহায়তা এবং বাজেট পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৬৯ সালে বেলজিয়ামের সহায়তায় পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের পরিকল্পনা চুড়ান্ত হলেও পাকিস্থান সরকার কোন পদক্ষেপ নেয় নি

PostImage

রূপপুর প্রকল্প: বঙ্গবন্ধুর প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তিকে শেখ হাসিনার বাস্তবায়ন এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সকল দলের নৈতিক ঐক্যের ফল


১৯৬১ সালে পাকিস্থান আমলেই এ পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছিল রূপপুরে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্থানের মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক আচরনের কারনে তা থমকে যায়। পশ্চিম পাকিস্থানের করাচিতে  ১৯৬৫ সালে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (KANNUP) নির্মানের জন্য কানাডার সাথে চুক্তি করে।

পাকিস্তান সরকার রূপপুর প্রকল্পের চেয়ে করাচি প্রকল্পকে অধিক গুরুত্ব দেয়। ফলে রূপপুরের জন্য প্রস্তাবিত কারিগরি সহায়তা এবং বাজেট পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৬৯ সালে বেলজিয়ামের সহায়তায় পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের পরিকল্পনা চুড়ান্ত হলেও পাকিস্থান সরকার কোন পদক্ষেপ নেয় নি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে অজুহাত দেখিয়ে প্রকল্পটি বাতিল করে। 

১৯৬৯ সালের এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমাম এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের জোর দাবি জানিয়েছিল, যা নির্দেশ করে তখনকার এ দাবী পূর্ব পাকিস্থানের জনগনের একটা বড় অধিকার ছিল যা পাকিস্থান সরকার তাদেরকে বঞ্চিত করে।


মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট:

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু  সরকার পরিত্যক্ত রূপপুর প্রকল্পটি পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তানের অবহেলার শিকার এই প্রকল্পটিকে তিনি নতুন স্বাধীন দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির ১৫ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে 'বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন' (BAEC) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর শাসনামলেই রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়।১৯৭৫ সালে দক্ষ জনবল ও পরমানু গবেষনার জন্য সাভারে ২৬৫ একর জায়গা বরাদ্দ দিয়ে পরমানু বিজ্ঞানী এস ওয়াজেদ মিয়াকে যুক্ত করেন। 

বঙ্গবন্ধু ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের সূত্রমতে।

বিভিন্ন বিশ্লষকদের মতে- বঙ্গবন্ধুর হাতেই বাংলাদেশের পরমাণু যাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছিল।

পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিভিন্ন সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছে এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ চালিয়ে গেছে।  ১৯৮৭ - ৮৮ তে হুশেইন মোহাম্মদ এরশাদের আমলে ফরাসি কোম্পানি সোফ্রাটম (১৯৭৭-৮৬) এবং জার্মান কোম্পানি লাহমেয়ার ইন্টারন্যাশনাল  প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও সমীক্ষা চালায়। ১৯৯৫ সালে বেগম খালেদা জিয়া এ প্রকল্পকে জাতীয় জ্বালানী নীতিতে যুক্ত করে এবং ১৯৯৬ তে আওয়ামীলীগ ক্ষমতা গ্রহনের পর সে নীতি সংশোধন করে ২০০০ সালে 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার এ্যাকশান প্ল্যান' (BANPAP) গ্রহণ করে।

পরবর্তীতে ২০০৯ এ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘ বিরতি সমাপ্তি হয়।  ২০১১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতার জন্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৭ সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের নির্মান কাজ শুরু হয়। 

দীর্ঘ এ যাত্রায় ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি সরকারই কিছু না কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেছে।  পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দলমত নির্বিশেষে একটা জাতীয় স্বার্থে পরিনত হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করেছে।

 সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে—যার প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন - দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামীলীগ সরকারে থাকার কারনেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

মূলত পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানে সকল সরকারের সাথে নৈতিক মিল থাকলেও বঙ্গবন্ধু সরকার এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তি দিয়েছিল আর শেখ হাসিনা সরকার তা বাস্তবিক রূপ প্রদান করেছে। 

জ্বালানী নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যক্তিবর্গের মতে- সকল বিতর্ককে ছাপিয়ে রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্র দেশের জ্বালানী নিরাপত্তায় প্রবল ভূমিকা রাখবে।

তথ্য বিশ্লেষণ : এস গোস্বামী 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর