ADB’র চোখে বাংলাদেশের সেরা প্রকল্প
বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে এলজিইডির Rural Connectivity Improvement Project (RCIP)। ১ কোটি ৮০ লাখ মানব-দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সফল বাস্তবায়নের জন্য এডিবির “Best Performed Project” স্বীকৃতি অর্জন করেছে প্রকল্পটি।
ADB’র চোখে বাংলাদেশের সেরা প্রকল্প
গ্রামীণ উন্নয়নে এক বড় অগ্রগতি—আরসিআইপি প্রকল্পে সৃষ্টি হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ মানব-দিন কর্মসংস্থান
এলজিইডির আরসিআইপি স্বীকৃতি পেল এডিবির “সেরা প্রকল্প” হিসেবে
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) বাস্তবায়িত Rural Connectivity Improvement Project (RCIP) দেশের অন্যতম সফল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বাংলাদেশে এডিবি অর্থায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে আরসিআইপিকে “Best Performed Project” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন এলজিইডি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান, যা গ্রামীণ ও শহুরে অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংস্থাটি সড়ক, সেতু, কালভার্ট, হাট-বাজার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ অবকাঠামো এবং ক্ষুদ্র পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে।
এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের মধ্যে Rural Connectivity Improvement Project (RCIP) টেকসই গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি মডেল প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ কামরুল ইসলাম জানান, আরসিআইপির মূল লক্ষ্য হলো উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চলগুলোকে সামাজিক-অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও বাজারের সঙ্গে আধুনিক, জলবায়ু সহনশীল সব-মৌসুমী গ্রামীণ সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত করা।
তিনি বলেন,
“আমাদের লক্ষ্য শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়। আমরা চাই গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে, যাতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সহজে বাজার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধায় পৌঁছাতে পারেন।”
আরসিআইপির প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—
• কৃষি ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের সঙ্গে গ্রামীণ সংযোগ বৃদ্ধি
• আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি
• জলবায়ু সহনশীল সব-মৌসুমী সড়ক উন্নয়ন
• প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি
• দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি
• জিআইএসভিত্তিক আধুনিক সড়ক পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ ব্যবস্থা উন্নয়ন
উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প নয়; বরং কৃষি, বাণিজ্য, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক গতিশীলতাকে সহায়তা করা একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশল।
আরসিআইপির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর পেশাদার ও অরাজনৈতিক বাস্তবায়ন পদ্ধতি। প্রকল্পের সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কৃষি উৎপাদনশীলতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। ফলে বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওয়ের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন কৃষি সমৃদ্ধ এলাকায় উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে।
২০১৮ সালে এডিবির ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তায় প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। সফল বাস্তবায়নের কারণে পরবর্তীতে অর্থায়ন বাড়িয়ে ৪৯০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৬,৪৯৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে এডিবি দিয়েছে ৪,৬৫৯ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে ১,৮৩৩ কোটি টাকা।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৮৪ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭২ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ভৌত অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ, যেখানে আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী জাতীয় গড় মাত্র ৩৬ শতাংশ।
এ পর্যন্ত ৩,০৮০ কিলোমিটার সব-মৌসুমী গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে এবং আরও ৯০০ কিলোমিটার সড়কের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানব-দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা মজুরি বিতরণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কর্মসংস্থান গ্রামীণ নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়, যখন দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, তখনও আরসিআইপি কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চালিয়ে যান। শ্রমিকদের সুরক্ষায় মাস্ক, স্যানিটাইজার ও চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, মহামারির সময় কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছিল অন্যতম অগ্রাধিকার। এডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগীরা বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্পটির প্রশংসা করেছে।
পরবর্তীতে ম্যানিলায় এডিবি সদর দপ্তর থেকে আরসিআইপি “Best Performance Award” অর্জন করে। এটি বাংলাদেশের এডিবি অর্থায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে এবং দক্ষিণ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলেও অন্যতম সেরা প্রকল্প হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
সময়, ব্যয় ও গুণগত মান দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা, শক্তিশালী আর্থিক শৃঙ্খলা, উন্নত নির্মাণমান, সফল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে অনেক অবকাঠামো প্রকল্প বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির সমস্যায় পড়ে, সেখানে আরসিআইপি দেখিয়েছে যে সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বড় প্রকল্পও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব।
প্রকল্পটি রংপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, নাটোর, রাজশাহী এবং বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে এনেছে। উন্নত সড়ক যোগাযোগের ফলে আলু, ভুট্টা, সবজি, ধান ও ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে।
এখন কৃষকরা কম সময় ও খরচে পণ্য পরিবহন করতে পারছেন, ফসল নষ্ট কম হচ্ছে এবং বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশাসনিক কেন্দ্র ও বাজারে মানুষের যাতায়াতও সহজ হয়েছে।
আরসিআইপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নকশা। এতে বন্যা সহনশীল সড়ক কাঠামো, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ভেটিভার ঘাসের মতো প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান ব্যবহার করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমাবে।
ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা পর্যন্ত জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গ্রামীণ এলাকাকে প্রধান বাণিজ্যিক রুটের সঙ্গে সংযুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি এখনও গ্রামীণ অর্থনীতি।