মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: বাংলাদেশের এলএনজি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশে এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কাতারের গ্যাস স্থাপনায় হামলার প্রভাবে সরবরাহ ব্যাহত, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, আর বিকল্প উৎসে নির্ভরতা কম হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: বাংলাদেশের এলএনজি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সংকট: বাংলাদেশে এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহে শঙ্কা
ঢাকা, ২১ মার্চ: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। বাড়তি চাহিদা ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে তেল ও গ্যাসের দাম। এর প্রভাব বাংলাদেশেও অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং গৃহস্থালি ও শিল্পে ব্যবহৃত এলপিজি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ১৭০-১৮০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাকি চাহিদা বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ এলএনজি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার থেকে। এছাড়া মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আসে।
তবে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে হামলার কারণে এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে বাংলাদেশের জন্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেমন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে গ্যাসের দাম ইতিমধ্যেই প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। কাতারের গ্যাস উৎপাদন স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরতে অন্তত সাত থেকে আট মাস সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, "যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমাদের এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিদেশ থেকে স্পট মার্কেটে এলএনজি কিনতে দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে।"
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সামলাতে ইতিমধ্যে স্পট বাইং করা হচ্ছে এবং বিকল্প উৎস থেকেও এলএনজি আমদানির চেষ্টা চলছে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি এলপিজির সরবরাহও পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
মন্ত্রী বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতকে নিরাপদ রাখতে বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। এলপিজি আমদানিতে আপাতত সংকট নেই বলে প্রতিষ্ঠানগুলো আশ্বস্ত করেছে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্পট বাইং তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎসে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করতে হবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, "দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারের লং টার্ম পরিকল্পনা ছাড়া বিশ্বের কোথাও সংকট হলে আমরা সহজে কাবু হই।"
অধ্যাপক ম. তামিম আরও বলেন, "সোলার ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো দরকার। ঘরে ঘরে ও সরকারি পর্যায়ে সোলার প্যানেল ব্যবহার সহজতর করতে হবে। এটি ভবিষ্যতে এলএনজি এবং এলপিজির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।"
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলা, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সীমিত বিকল্প উৎসের কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে। সরকারের স্পট বাইং এবং বিকল্প উৎসের চেষ্টা তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতকে সুষ্ঠুভাবে চালাতে হলে বিকল্প উৎসের সন্ধান, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।