৪০ বছর পর বিশ্বমঞ্চে বড় লড়াই—জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-এর সভাপতি পদে বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও শান্তিরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকার পর এবার বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে জায়গা করে নিতে চায় বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে অংশগ্রহণ দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
৪০ বছর পর বিশ্বমঞ্চে বড় লড়াই—জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-এর সভাপতি পদে বাংলাদেশ
দীর্ঘ চার দশক পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UNGA)-এর সভাপতি পদে প্রার্থী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ—এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ওআইসি-এর নির্বাহী কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে জেদ্দা সফর শেষে দেশে ফিরে তিনি জানান, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতা ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে।
৪০ বছর পর কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রার্থিতা?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি প্রতীকী হলেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পরিষদের সভাপতি:
-
বৈশ্বিক নীতিগত আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন
-
জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার, শান্তিরক্ষা ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় করেন
-
উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কণ্ঠ জোরালো করতে পারেন
বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের পর থেকে শান্তিরক্ষা, জলবায়ু কূটনীতি ও উন্নয়ন সহযোগিতায় সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে। ফলে ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি পদে প্রার্থিতা—দেশটির পররাষ্ট্রনীতির পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।
জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা: কোন ভিত্তিতে?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সফরকালে মালদ্বীপ, পাকিস্তান, তুরস্ক, ফিলিস্তিন ও সৌদি আরব-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের প্রার্থিতা নিয়ে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভাবনার পেছনে কয়েকটি যুক্তি কাজ করছে—
-
শান্তিরক্ষায় নেতৃত্ব: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ অবদানকারী দেশগুলোর একটি।
-
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের কণ্ঠস্বর: জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছে।
-
দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা: উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
-
মুসলিম বিশ্বের সমর্থন সম্ভাবনা: ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সমর্থন প্রার্থিতাকে শক্তিশালী করতে পারে।
যদিও চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে আঞ্চলিক রোটেশন, কূটনৈতিক সমর্থন ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ওপর, তবুও প্রাথমিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরছে।
জয়ী হলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ
বাংলাদেশ যদি সভাপতি পদে জয়ী হয়, তাহলে সম্ভাব্য কয়েকটি কৌশলগত লাভ হতে পারে—
১. বৈশ্বিক মর্যাদা ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি
সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক নীতি-আলোচনায় সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা ও দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়বে।
২. অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদার
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs), জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রশ্নে অগ্রাধিকারমূলক অবস্থান নিতে পারবে।
৩. রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সমর্থন
রোহিঙ্গা ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সমর্থন চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। সভাপতি পদ দেশের কণ্ঠকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
৪. দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনৈতিক ভারসাম্য
আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে—বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চলমান উত্তেজনা প্রসঙ্গে—বাংলাদেশের নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।
অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ইতোমধ্যে যে লাভ
এমন উচ্চপদে প্রার্থী হওয়াটাই নিজেই একটি কূটনৈতিক বার্তা। এতে—
-
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বৃদ্ধি পাচ্ছে
-
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অগ্রাধিকারগুলো বিশ্বমঞ্চে আলোচিত হচ্ছে
-
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির বার্তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছাচ্ছে
ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, ১৯৬৭ সালের পূর্বসীমা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান অবিচল। এই নীতি জিয়াউর রহমান-এর সময় থেকে ধারাবাহিকভাবে অনুসৃত হয়ে আসছে।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতা কেবল একটি নির্বাচন নয়; এটি বাংলাদেশের বহুমাত্রিক কূটনৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ভূমিকাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।