“উন্নয়ন স্থবির, বিনিয়োগ স্থবির, ব্যয় মেটাতে ঋণ—বিদায়ী ইউনুস সরকারের আর্থিক ব্যর্থতার ছবি
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পর দ্বিতীয়বার চলতি ব্যয় মেটাতে ঋণ—এই চিত্র কি শুধু সাময়িক চাপ, নাকি বিদায়ী ইউনুস সরকারের গভীর আর্থিক ব্যর্থতার পরিচয়?
“উন্নয়ন স্থবির, বিনিয়োগ স্থবির, ব্যয় মেটাতে ঋণ—বিদায়ী ইউনুস সরকারের আর্থিক ব্যর্থতার ছবি
উন্নয়ন স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ
১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র
প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় চলতি ব্যয় মেটাতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছে সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি ইমপ্লিমেন্টেশন।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে আয়োজিত “নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা” শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তথ্য উপস্থাপন করেন Center for Policy Dialogue (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পর দ্বিতীয়বারের মতো কোনো সরকার পরিচালন ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হলো—যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজস্ব বনাম পরিচালন ব্যয়: কোথায় ঘাটতি?
উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার কোটিরও বেশি।
এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, সাধারণত বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের মতো চলতি ব্যয় রাজস্ব আয় থেকেই মেটানো হয়। সেখানে ঋণের আশ্রয় নেওয়া রাজস্ব কাঠামোর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
উন্নয়ন কার্যক্রমে মন্থর গতি
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি কমেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীর হয়েছে, নতুন প্রকল্প অনুমোদন সীমিত হয়েছে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হার কমেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি মহল বলছে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে উন্নয়ন ব্যয় সীমিত করা হয়েছিল। তবে সমালোচকদের মতে, এর ফলে অর্থনীতির ভেতরের গতি কমেছে।
অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমে প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে ব্যয় কমলে—
-
নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়
-
সিমেন্ট, স্টিল ও পরিবহন খাতে প্রভাব পড়ে
-
কর্মসংস্থান কমে
-
বাজারে নগদ প্রবাহ হ্রাস পায়
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি অংশ বাজারে বিক্রি কমে যাওয়া ও নগদ সংকটের অভিযোগ তুলেছেন।
তৈরি পোশাক খাতের পরিস্থিতি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পও গত দেড় বছরে চাপের মুখে ছিল। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের প্রভাব পড়েছে খাতে। কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ইউরোপ-আমেরিকার বাজার সংকোচনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
গত ১৮ মাসে প্রত্যাশিত হারে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত দ্বিধা, জ্বালানি পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ সংকোচনের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ জোরদারে কার্যকর নীতির বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
সামষ্টিক স্থিতিশীলতায় আংশিক সাফল্য
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। যেমন—
-
রেমিট্যান্স বৃদ্ধি
-
রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত থাকা
-
আমদানি কমায় বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য
-
পুরোনো বিদেশি ঋণ পরিশোধ
-
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বড় ধরনের পতন এড়ানো
তিনি উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানো ও সুদের হার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে আংশিক সাফল্য এসেছে। তবে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে না পারাকে তিনি বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
কেন ঋণ নিতে হলো?
উন্নয়ন ব্যয় সীমিত রাখার পরও পরিচালন ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করছেন—
-
কর আহরণে দুর্বলতা
-
প্রশাসনিক ব্যয়ের চাপ
-
সুদ পরিশোধের বৃদ্ধি
-
পূর্ববর্তী বকেয়া দায়
-
ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়
অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ে কাটছাঁট করা হলেও পরিচালন ব্যয় কমেনি।
সামনে চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজন—
-
কর ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার
-
রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি
-
বিনিয়োগবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন
-
উন্নয়ন প্রকল্পে গতি ফিরিয়ে আনা
-
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার
রাজস্ব ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও উন্নয়ন কার্যক্রমে মন্থরতা, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং রাজস্ব ঘাটতি অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
চলতি ব্যয় মেটাতে ঋণ গ্রহণ—এটি একদিকে আর্থিক চাপে সরকারের অবস্থানকে নির্দেশ করছে, অন্যদিকে রাজস্ব কাঠামো ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।