আন্দোলনের ফাঁদ পেতে ব্যর্থ?—সংযত কৌশলে পাল্টা চাল আওয়ামী লীগের
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আয়োজিত জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে একদিকে টিআইবির সমালোচনামূলক প্রতিবেদন, অন্যদিকে সরকারের পাল্টা ব্যাখ্যা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা কি সংস্কারের অংশ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল ছিল ?
আন্দোলনের ফাঁদ পেতে ব্যর্থ?—সংযত কৌশলে পাল্টা চাল আওয়ামী লীগের
টিআইবি প্রতিবেদন, সরকারের প্রতিক্রিয়া ও অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশল: নির্বাচন–পরবর্তী বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ
ঢাকায় প্রকাশিত সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের গবেষণার জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোটের তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১২৫টি।
সংস্থাটি বলেছে, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও পরে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা পুরোনো চর্চায় ফিরে যায়। আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা বেড়েছে, যা ভোট-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল।
আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিতর্ক
টিআইবির তথ্যানুযায়ী, ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের অন্তত একটি লঙ্ঘন করেছেন। অর্থ, ধর্ম, পেশীশক্তি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক প্রভাবের ব্যবহার বেড়েছে।
নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন তুলনামূলক সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য। “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পেছনে কিছু থাকতে পারে, তবে পর্যবেক্ষণে সরাসরি প্রমাণ মেলেনি।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ পুরোপুরি নির্বাচনের বাইরে ছিল—এ কথা বলার সুযোগ নেই; তৃণমূল পর্যায়ে বহু নেতা-কর্মী ভোট দিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক—সে প্রশ্ন থাকবেই।
সরকারের প্রতিক্রিয়া: সংখ্যা বনাম শ্রেণিবিন্যাস
সরকারি বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এ প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনে ১৫ জন নিহতের তথ্য টিআইবি দিলেও পুলিশের নথি অনুযায়ী সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে মাত্র পাঁচটির ক্ষেত্রে।
সরকার দাবি করে, এটি ধামাচাপা নয়; বরং শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতির পার্থক্য। টিআইবি রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন যে কোনো নিহতকে নির্বাচন-সম্পর্কিত হিসেবে ধরেছে, সরকার কেবল প্রমাণযোগ্য সংশ্লিষ্ট ঘটনাকেই গণনায় নিয়েছে।
সরকার অতীতের ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের সহিংসতার উদাহরণ টেনে বলেছে—বর্তমান পরিস্থিতিকে ভয়াবহ নিরাপত্তা ভাঙন বলা অতিরঞ্জিত।
মূল বিতর্ক: অন্তর্ভুক্তিমূলকতা না কৌশলগত বর্জন?
এখানেই বিশ্লেষকদের নজর যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলের দিকে।
আগে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপি–জামায়াতকে কার্যত বাইরে রেখে নির্বাচন করেছিল—যা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে বিএনপি–জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন আয়োজন করেছে।
সমালোচকদের মতে, এটি শুধু আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। তাদের যুক্তি—
আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে রাখলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো তীব্র ও অনিশ্চিত।
নিষিদ্ধ করলে দলটি রাজপথে লাগাতার আন্দোলনে গেলে নির্বাচন বিলম্বিত হতো, ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি হতো।
তবে আওয়ামী লীগ প্রত্যাশিত মাত্রায় রাজপথে না নেমে বিবৃতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ থাকায় সেই কৌশল পুরোপুরি সফল হয়নি।
এছাড়া সমালোচকরা বলছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-কে সামগ্রিকভাবে নিষিদ্ধ না করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা পেত। দল নিষিদ্ধ হওয়ায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
জামায়াতের উত্থান ও ক্ষমতার ভারসাম্য
রাজনৈতিক মহলে আরেকটি আলোচিত বিষয়—জামায়াতের উল্লেখযোগ্য আসনপ্রাপ্তি। সমালোচকদের ভাষ্য, ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত সুবিধা দিয়ে দলটিকে পুনরায় শক্ত অবস্থানে আনা হয়েছে।
তাদের মতে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রেখে বিএনপি–জামায়াত জোটকে সামনে আনা ছিল ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য গঠনের অংশ।
সংস্কার কমিশন ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দুই বছরে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। গণভোটে কিছু প্রস্তাব পাসও হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—যদি আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে ক্ষমতায় ফেরে, এই সংস্কারের স্থায়িত্ব কতটা থাকবে?
অর্থনীতি ও উন্নয়ন খাতে স্থবিরতা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং প্রশাসনিক ধীরগতিও সরকারের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে নির্বাচন তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক; সরকার বলছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে অন্য প্রশ্ন—আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা কি গণতান্ত্রিক প্রয়োজন ছিল, নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের কৌশল?
সমালোচকদের মতে, ইউনূস সরকারের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল নতুন ক্ষমতার কাঠামো ও সংস্কারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। আওয়ামী লীগের চতুর ও অপেক্ষাকৃত সংযত অবস্থান সেই পরিকল্পনাকে পুরোপুরি সফল হতে দেয়নি।
ফলে নির্বাচন যতই “তুলনামূলক সুষ্ঠু” বলা হোক, অন্তর্ভুক্তিমূলকতা ও রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন এখনো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।