হ্যাঁ’ ভোটে সংস্কার, কিন্তু লাভ কার?

২০২৬ সালের নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নির্বাচন। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জন্ম দিয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের নামে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কারগুলো যেমন সম্ভাবনার কথা বলছে, তেমনি এগুলো ঘিরে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি ও আশঙ্কা। বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে কারা লাভবান হবে এবং কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে—তা নিয়ে রাজনীতিতে শুরু হয়েছে গভীর আলোচনা।

PostImage

হ্যাঁ’ ভোটে সংস্কার, কিন্তু লাভ কার?


হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হলে জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়িত হলেও জামায়াত রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে এবং আওয়ামী লীগ–বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নির্বাচন ২০২৬—বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচন, যেখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণভোট জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের প্রস্তাবিত একটি পদ্ধতি হলেও এতে কিছু আশঙ্কা রয়েছে। গণভোটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সকল শ্রেণির মানুষ জেনে-বুঝে তাদের মতামত দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। আবার একাধিক প্রশ্নের বিপরীতে একটি উত্তর থাকায় প্রকৃত মতামতের স্বচ্ছতা ব্যাহত হচ্ছে। প্রান্তিক, অশিক্ষিত ও নিম্ন শ্রেণির ভোটাররা এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে অবগত নন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ায় সরকারের নিরপেক্ষতা ও ফলাফল নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

কারণ ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইনগত সংস্কার কার্যকর হবে, যার মধ্যে ৩০টি সংস্কার বাধ্যতামূলক। অথচ এসব সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই বহু ক্ষেত্রে দ্বিমত রয়েছে।

সংস্কার প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়—দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে উচ্চকক্ষের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন পিআর (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতিতে। দলগুলো নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হারে পর্যায়ক্রমে নামের তালিকা দেবে। সে ক্ষেত্রে কোনো দল সংসদীয় আসন না পেলেও প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ অনুযায়ী উচ্চকক্ষে সদস্য দিতে পারবে।

অনাস্থা প্রস্তাব ও বাজেট বিল ছাড়া উচ্চকক্ষ যেকোনো বিল অনুমোদন করতে পারবে এবং নিম্নকক্ষে উত্থাপিত যেকোনো বিলে দ্বিমত পোষণ করতে পারবে। অর্থাৎ আইন প্রণয়ন, ভেটো ক্ষমতা, সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগসহ নানা বিষয়ে উচ্চকক্ষের ব্যাপক প্রভাব থাকবে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বৃহৎ দুটি জোট—বিএনপি ও জামায়াত—এবং তাদের শরিকদের মধ্যে স্ব স্ব ভোটের তাৎপর্য বিএনপি জোটের শরিকদের তুলনায় জামায়াতের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন জরিপ ও পরিবর্তিত বাস্তবতায় জনগণের ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। বস্তুত বলা যায়, বিএনপি বর্তমান নির্বাচনে সবচেয়ে বড় দল হলেও জোটগত হিসেবে উচ্চকক্ষে জামায়াতে ইসলামের একচেটিয়া প্রভাব থাকবে।

৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল: ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ফলে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের কোনো বিল বা সংসদীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অধিকার পাবেন। এতে কিছু ঝুঁকি রয়েছে—সরকারের স্থায়িত্ব সংকট, হর্স ট্রেডিং, দলীয় কোন্দল, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও স্বার্থ আদায়ের প্রবণতা। কোনো সরকারের সংসদ সদস্যরা যদি বারবার নিজ দলের গুরুত্বপূর্ণ বিল বা নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে সরকারের স্থায়িত্ব সংকট তৈরি হতে পারে। প্রভাবশালী গোষ্ঠী হর্স ট্রেডিং বা রাজনৈতিক বেচাকেনার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে দেশ ও দলের বিরুদ্ধে ভোট আদায় করতে পারে। ভুল বোঝাবুঝি থেকে দলীয় কোন্দল বাড়বে এবং দলের চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একই ব্যক্তি দুই বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না এবং একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না।

এই পদ্ধতির বাস্তবায়নে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে দলীয় গণতন্ত্র ও দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দলগুলোর। যদিও এ দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোয় গণতন্ত্র বিদ্যমান, তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো প্রধানত দলীয় প্রধানের ওপর নির্ভরশীল। দলীয় গ্রুপিং ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের প্রতি অনাস্থার কারণে সমর্থকরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই পারিবারিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা এবং বিএনপিতে খালেদা জিয়া একই সময়ে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে একদিকে পারিবারিক রাজনীতিকে দুর্বল করা হবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বিভাজিত করার একটি রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও জামায়াত রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

তবে এই বিশাল সংস্কারের ম্যান্ডেট পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন এবং সব মতাদর্শের অংশগ্রহণ। কিন্তু আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অনুপস্থিতিতে এত বড় সংস্কার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, যা ভবিষ্যতে দেশকে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে জনগণের ম্যান্ডেট যেমন বাস্তবায়িত হবে, তেমনি রাজনৈতিকভাবে জামায়াত ইসলাম লাভবান হবে। অর্থাৎ জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে বৃহৎ আশঙ্কায় পরিণত হতে পারে।


by:  Sudam Goswami 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর