বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথিকৃৎ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির দক্ষ স্থপতি

একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় নিঃসঙ্গ দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজকীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে দেওয়া—এই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা, সামরিক শাসনের ভেতর থেকেই বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন এবং কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার—সব মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।

PostImage

বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথিকৃৎ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির দক্ষ স্থপতি


বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে এক বনেদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা রসায়নবিদ মনসুর রহমান এবং মা জাহানারা খাতুন রানী। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়; ডাকনাম ছিল কমল।

১৯৫৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। একটি স্বতন্ত্র সেক্টরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে জেড ফোর্স, যা মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও শৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হওয়ায় তিনি দ্রুতই জাতির আস্থার প্রতীকে পরিণত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশে গভীর রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতা তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক-সামরিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ওই বছরের ২৫ আগস্ট তিনি সেনাবাহিনী প্রধান এবং ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা এখানেই ভিন্নতা তৈরি করে। ক্ষমতায় এসে তিনি সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার পথে না গিয়ে রাজনৈতিক বৈধতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ধাপে ধাপে সামরিক আইন শিথিল করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

একই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় তিনি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজকীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন আরব দেশের শাসকদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

এই সুসম্পর্কের ফলেই বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারিত হয়, প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয় এবং মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। একজন ছোট ও গরিব দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও জিয়াউর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের রাজকীয় শাসকদের কাছে বাংলাদেশকে বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন।

পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও তিনি বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যান। আঞ্চলিক ভারসাম্য, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিতেও একটি স্বতন্ত্র দর্শন তৈরি করে।

মার্শাল ল–এর মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও তিনি সেই কাঠামোকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের পথ দেখান—যা তাঁকে অন্যান্য সামরিক শাসকদের থেকে আলাদা করেছে। এ কারণেই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তিনি ছিলেন এমন এক রাষ্ট্রনায়ক, যিনি সামরিক শাসনের ভেতর থেকেও গণতন্ত্র, কূটনীতি ও রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন শহীদ জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।

৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি দুদিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আজ শেরেবাংলা নগরে তাঁর মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ এবং আগামীকাল কাকরাইলে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শহীদ জিয়াকে স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অভিহিত করে গভীর শ্রদ্ধা জানান।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নেতৃত্ব থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এই বহুমাত্রিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে আজও এক অনন্য ও যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে আছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর