অন্তর্ভুক্তি ছাড়া নির্বাচন কি গণতান্ত্রিক? বড় প্রশ্ন তুলছে ২০২৬-এর তফসিল

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বাংলাদেশে নির্বাচন আয়োজনের আইনগত বৈধতা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক অবস্থান এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংবিধানের নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম, আদালতের রায়ের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচন আদৌ অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে কি না—তা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

PostImage

অন্তর্ভুক্তি ছাড়া নির্বাচন কি গণতান্ত্রিক? বড় প্রশ্ন তুলছে ২০২৬-এর তফসিল


২০২৬ সালের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাচন করার আইনগত জটিলতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচনের আইনানুগ মানদণ্ডের ভিত্তি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করবে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাচন করার আইনগত প্রশ্ন রয়েছে যেখানে এ সরকারের অবকাঠামো কোর্টের মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে এবং সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট শপথ গ্রহণ করেছে। সেক্ষেত্রে তাদের সাংবিধানিক পদ্ধতিকে ভঙ্গ করলে তা আইনসম্মত হবে না।

সংবিধানের ১২৩ (৩) খ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে মেয়াদ অবসান ব্যতীত যে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে। তবে একই অনুচ্ছেদে ৪ নং উপধারায় বলা হয়েছে কোনো দৈবদুর্বিপাক বা বৃহৎ সংকটে উক্ত মেয়াদে নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে মেয়াদের শেষ দিন থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাংবিধানিক পদ্ধতিতে নির্বাচন করার সকল মেয়াদ বহু আগেই অতিক্রম করেছে। কোর্ট Doctrine of Necessity বা জরুরি আবশ্যিকতার নীতি অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বৈধতা দিলেও সংবিধানে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।

২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে সে রায় অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করা হয়। অর্থাৎ, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু করা হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থার বৈধতা জুলাই সনদ ও কোর্টের রায়ই একমাত্র পথ। কিন্তু যেহেতু সংবিধান রহিত বা স্থগিত নয় সেক্ষেত্রে এ সরকারের বৈধতা প্রশ্নে রায় অবৈধ হিসেবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করলে সাংবিধানিক অনুচ্ছেদই সর্বোচ্চ আইন। আর আদালতের রায় সেই সংবিধানের ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ মাত্র। তাই সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ মূল ভিত্তি হলেও আদালতের রায় বিশেষত সুপ্রিম কোর্টের রায় সংবিধানের ব্যাখ্যা দেয় এবং অনুচ্ছেদকে কার্যকর বা প্রয়োগ নির্ধারণ করে, যা বাস্তব ক্ষেত্রে সাংবিধানিক অনুচ্ছেদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং প্রয়োজনে কোনো অনুচ্ছেদকে ব্যাখ্যা কিংবা বাতিল করতেও পারে। কিন্তু আদালত যদি সাংবিধানিক আলোকে ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে সে রায় অবৈধ হবে এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদই চূড়ান্ত গুরুত্ব পাবে। তাই এ সরকারের গঠন প্রক্রিয়া ও নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না করা বিষয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

নির্বাচনের নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বেশ কিছু আইনি বাধা রয়েছে। সংবিধানের ৮ (গ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে। আর গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো বহুদলীয় ব্যবস্থা এবং জনগণের স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি বাছাইয়ের অধিকার। তাই নির্বাচন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। ৫ আগস্ট পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে আদালত এবং প্রায় সকল শীর্ষ পর্যায়ের নেতা দেশের বাইরে আছেন যারা বিভিন্ন মামলার আসামি। সেক্ষেত্রে তাদের নির্বাচনে যোগদানের কোনো সম্ভাবনা নেই এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বলে বিভিন্নভাবে ব্যক্ত করেছে। বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৯৮৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের গড়ে ৩০ থেকে ৩১ শতাংশ ভোট ছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৪ শতাংশ ভোট পায় যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ না থাকায় বর্তমান সরকার সেই নির্বাচনসমূহকে অবৈধ ঘোষণা দিয়ে ওই তিন নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে মামলা করে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা রাষ্ট্রদ্রোহের সমান। বর্তমান নির্বাচন কমিশনার আওয়ামী লীগের এ বিপুল জনসমষ্টিকে তাদের মতামত জানানোর সুযোগ থেকে বিরত রেখে যে নির্বাচন করবেন, পরবর্তীতে সেই কমিশনও ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের মতো অভিযুক্ত হতে পারেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং ৩৮ নং অনুচ্ছেদে নাগরিকের সমিতি বা সংঘ করার রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী জনগণ সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করে পছন্দমতো প্রতিনিধি বাছাইয়ের মাধ্যমে। এ অধিকার ব্যাহত হলে নির্বাচন কমিশন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারকে সে দায় নিতে হবে। তাই এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তা অগণতান্ত্রিক ও সংবিধান পরিপন্থী হবে।

নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া কতটুকু আইনসম্মত তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধানের ১১৮ এর ১ নং উপধারায় বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠন থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা করে তা গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করবে এবং রাষ্ট্রপতির সুপারিশের জন্য পাঠাবে। জনগণ যাদের উপর আস্থা রাখবেন তাদের সম্পর্কে জানা উচিত কিন্তু যে কমিশন গঠন হয়েছে সে ব্যক্তিদের সম্পর্কে দেশের মানুষের কোনো ধারণাই নেই। আবার যে সংসদকে বর্তমান সরকার অবৈধ হিসেবে আপত্তি তুলছে সেই সংসদের নিযুক্ত রাষ্ট্রপতির নিকট এই নির্বাচন কমিশন শপথ নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করছেন। সেক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সংসদকেও বৈধতা দেওয়া হবে বলে মনে করেন অনেক আইনজ্ঞ। আর সেটি হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টিও আইনি সংজ্ঞায় এ সরকারের ব্যাখ্যা দিতে হবে।


এস গোস্বামী : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর