আট মাসে চীন আনল ১১৪১ টন সোনা, ব্যয়ে ছাড়াল লাখ কোটি টাকা

আট মাসেই রেকর্ড পরিমাণ সোনা আমদানি করেছে চীন, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা, দুর্বল আবাসন বাজার ও মুদ্রা বৈচিত্র্যের চাপে বাড়ছে সোনার চাহিদা।

আট মাসে চীন আনল ১১৪১ টন সোনা, ব্যয়ে ছাড়াল লাখ কোটি টাকা
আট মাসে চীন আনল ১১৪১ টন সোনা, ব্যয়ে ছাড়াল লাখ কোটি টাকা

চীনের সোনা আমদানিতে চলতি বছর বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। শুল্ক বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশটি প্রায় ১ হাজার ১৪১ টন সোনা আমদানি করেছে। আট মাসের এই আমদানির পরিমাণ এরই মধ্যে ২০২৫ সালের পুরো বছরের আমদানিকে ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে সোনা কেনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ১৫ হাজার ৮৮০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান। ফলে প্রচলিতভাবে বলা ১৫০ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি কাছাকাছি হলেও সর্বশেষ প্রতিবেদনে প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি। 

তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, মূল দাবিটি সত্য। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এক হাজার টনের বেশি আমদানির কথা বলা হলেও সর্বশেষ হিসাবে জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে আমদানির পরিমাণ প্রায় ১১৪১ টন। অর্থাৎ শুধু এক হাজার টন নয়, এর চেয়েও প্রায় ১৪১ টন বেশি সোনা চীনে ঢুকেছে। একই সঙ্গে আমদানির মোট মূল্য ১৫০ বিলিয়ন ডলারের পরিবর্তে প্রায় ১৫৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এই প্রবৃদ্ধির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সময়ের তুলনা। ২০২৫ সালের পুরো বছরে চীন প্রায় ৮৮৬ টন সোনা আমদানি করেছিল। অথচ ২০২৬ সালের মাত্র আট মাসেই সেই পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে। শুল্ক-ভিত্তিক ধারাবাহিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের এই আট মাসের আমদানি পরিমাণ ২০১৭ সালের পর একই সময়ের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। 

চীনের সোনা কেনার পেছনে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক দায়ী এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ক্রেতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পক্ষের চাহিদা একসঙ্গে আমদানিকে বাড়িয়েছে। বিশ্ব সোনা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ২০ দশমিক ২ টন সোনা মজুতে যোগ করেছে। এর ফলে আগস্টের শেষে দেশটির সরকারি সোনা মজুত বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ টনে দাঁড়ায়। টানা ২২ মাস ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার মজুত বাড়িয়েছে। 

তবে মোট আমদানির তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনাকাটা অনেক ছোট। অর্থাৎ ১১৪১ টনের পুরোটাই সরকারি মজুত বৃদ্ধির জন্য কেনা হয়েছে এমন দাবি সঠিক হবে না। বড় অংশ এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক চাহিদা থেকে। চীনে সোনার বার ও মুদ্রায় বিনিয়োগের প্রবণতাও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটিতে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা ও মুদ্রা বিক্রি প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়ে ৩৩৯ টনে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট শিল্পতথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এই প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশটির আবাসন খাত দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। শেয়ারবাজারে প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা না থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী বিকল্প সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। একই সময়ে সরকারি ঋণপত্রের সুদের হারও তুলনামূলকভাবে নিচে নেমেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার জন্য সোনাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখছেন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। 

চীনা মুদ্রার তুলনামূলক শক্ত অবস্থানও আমদানিকে উৎসাহিত করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কমার সময় শক্তিশালী চীনা মুদ্রা দিয়ে বিদেশ থেকে সোনা কেনা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। পাশাপাশি চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে সোনার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকায় আমদানিকারকদের জন্যও বাড়তি প্রণোদনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্য ব্যবধান আমদানির প্রবাহ বাড়ানোর অন্যতম কারণ। 

জুন মাসেও চীনের সোনা আমদানি উল্লেখযোগ্য ছিল। বিশ্ব সোনা পরিষদের হিসাবে, ওই মাসে নিট আমদানি প্রায় ১৫২ টনে পৌঁছেছিল, যা ২০২৪ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি মাসিক সংখ্যা। বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট আমদানি ছিল প্রায় ৭৬৪ টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৮ শতাংশ বেশি। জুলাইয়ে আমদানি কিছুটা কমে প্রায় ১১৮ টনে নেমে এলেও তা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি ছিল। 

অন্যদিকে, সোনার গয়নার চাহিদা একই গতিতে বাড়েনি। আগস্টে সাংহাইয়ের প্রধান সোনা বাজার থেকে উত্তোলন ৬২ টনে নেমে আসে, যা মাসভিত্তিক হিসাবে ২২ শতাংশ এবং বছরভিত্তিক হিসাবে ২৭ শতাংশ কম। উচ্চ দাম এবং গয়নার বাজারে দুর্বল চাহিদা এর অন্যতম কারণ বলে বিশ্ব সোনা পরিষদ জানিয়েছে। অর্থাৎ চীনের বর্তমান সোনা কেনার ঢেউ মূলত গয়না ব্যবহারের চেয়ে বিনিয়োগ ও সম্পদ সংরক্ষণের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। 

এই প্রবণতার আন্তর্জাতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা উৎপাদক এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজারগুলোর একটি। দেশটির বিপুল আমদানি আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মজুত বৈচিত্র্যকরণ এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও সোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণেও চীনের শক্তিশালী চাহিদাকে সোনার দামের অন্যতম কাঠামোগত চালিকা শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

তবে বর্তমান আমদানির গতি পুরো বছর একই থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। সোনার দাম আরও বাড়লে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে এবং গয়নার চাহিদা আরও দুর্বল হতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে আমদানির আকর্ষণ বাড়তে পারে। তাই বছরের শেষ চার মাসে চীনের আমদানির গতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীনের আট মাসে এক হাজার টনের বেশি সোনা আমদানির দাবিটি সত্য এবং সর্বশেষ হিসাবে পরিমাণ প্রায় ১১৪১ টন। তবে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি আনুমানিক; প্রতিবেদিত ব্যয় প্রায় ১৫৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিপুল আমদানি শুধু সরকারি মজুত বৃদ্ধির ফল নয়; বরং ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সম্পদ বৈচিত্র্যকরণের সম্মিলিত প্রবণতার প্রতিফলন।


প্রতিবেদক

CSB News USA

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…