জাতিসংঘে আলেকজান্ডার সোরোসের সঙ্গে তারেক রহমান ও খলিলুর রহমানের বৈঠক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ব্যস্ত কূটনৈতিক পরিসরে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আলেকজান্ডার সোরোসের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের পৃথক বৈঠক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলমান সংস্কার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
জাতিসংঘে আলেকজান্ডার সোরোসের সঙ্গে তারেক রহমান ও খলিলুর রহমানের বৈঠক
আলেকজান্ডার সোরোস নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করেন। ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ পর্যায়ে শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে নাগরিক সমাজের ভূমিকা।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের অংশ হিসেবে সংস্কার কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
তবে এই বৈঠককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমর্থন, অর্থায়ন কিংবা নতুন প্রকল্পের ঘোষণা হিসেবে দেখার মতো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বরং প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গণতান্ত্রিক উত্তরণ, সংস্কার, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা।
কে আলেকজান্ডার সোরোস?
আলেকজান্ডার সোরোস যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সোরোসের ছেলে।
তবে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং সংস্থাটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব এক নয়। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট হলেন বিনাইফার নওরোজি। আলেকজান্ডার সোরোস মূলত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত দিকনির্দেশনা ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে ভূমিকা রাখেন।
ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিমূলক সরকার, গণতান্ত্রিক চর্চা, শিক্ষা এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়ন ও সহযোগিতা করে থাকে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ওপেন সোসাইটির সম্পর্ক বহু পুরোনো
আলেকজান্ডার সোরোসের সঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বর্তমান যোগাযোগকে বুঝতে হলে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সংস্থাটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশে মানবাধিকার, বিচার, শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যান্য সামাজিক বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়ন ও সহযোগিতা করে আসছে ওপেন সোসাইটি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানকারী স্থানীয় সংগঠনগুলোকেও প্রতিষ্ঠানটি সহযোগিতা করেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। চট্টগ্রামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে ওপেন সোসাইটির সহায়তা ছিল। নারীর উচ্চশিক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে আসছে।
ঢাকায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের একটি উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ওপেন সোসাইটি সহযোগিতা করেছে।
রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে ওপেন সোসাইটি
বাংলাদেশে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মানবিক উদ্যোগগুলোর একটি ছিল রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তা।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর তাদের এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ১০ মিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি তহবিল ঘোষণা করা হয়। এই অর্থের বড় অংশ ব্র্যাকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত মানবিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।
শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা, জীবিকা এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর তৈরি হওয়া চাপ মোকাবিলাতেও এই সহায়তার লক্ষ্য ছিল।
অর্থাৎ বাংলাদেশে ওপেন সোসাইটির কার্যক্রম কেবল রাজনৈতিক বা নীতিগত আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, আইনি সেবা, নাগরিক সমাজ ও সামাজিক উন্নয়নেও তাদের পূর্ববর্তী সম্পৃক্ততার নজির রয়েছে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কী ভূমিকা রাখতে পারে?
বর্তমান বৈঠকের পর বাংলাদেশে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নতুন কোনো প্রকল্প বা অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে প্রতিষ্ঠানটির আগের কর্মক্ষেত্র এবং সাম্প্রতিক আলোচনার বিষয় বিবেচনায় কয়েকটি সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র সামনে আসতে পারে।
প্রথমত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন। বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় নাগরিক অংশগ্রহণ, জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণে আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশনগুলোর সহযোগিতা কাজে লাগতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তরুণ নেতৃত্ব ও শিক্ষা। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং তরুণদের নাগরিক অংশগ্রহণের মতো ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নতুন কর্মসূচির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রাপ্তি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে নতুন উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশে ওপেন সোসাইটির পূর্ববর্তী মানবিক সহায়তার অভিজ্ঞতার কারণে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সুরক্ষায় ভবিষ্যতে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
পঞ্চমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু। ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলেকজান্ডার সোরোসের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন উঠে আসায় প্রযুক্তির সুশাসন, ডিজিটাল বৈষম্য, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের মতো বিষয় ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক যোগাযোগের নতুন অধ্যায়?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ড. খলিলুর রহমান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘের নির্ধারিত অগ্রাধিকারের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু ও পরিবেশ, মানবাধিকার ও মানবিক কার্যক্রম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সুশাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কার রয়েছে।
ফলে আলেকজান্ডার সোরোসের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকার বিষয় উঠে আসা অধিবেশনের বৃহত্তর বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, সংস্কার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতার বিষয় উঠে এসেছে।
এই বৈঠককে বাংলাদেশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক আর্থিক বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ঘোষণা হিসেবে দেখার চেয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়।
বাংলাদেশের জন্য এর বাস্তব গুরুত্ব নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এই যোগাযোগ থেকে শিক্ষা, সুশাসন, মানবিক সহায়তা, তরুণ নেতৃত্ব, প্রযুক্তি, জলবায়ু কিংবা নাগরিক সমাজের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর অংশীদারিত্ব তৈরি হয় কি না তার ওপর।