ভারত থেকে ধীরে ধীরে ‘সক্রিয় রাজনীতিতে’ ফিরছেন শেখ হাসিনা

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হচ্ছেন। তিনি অনলাইনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে নতুন করে সক্রিয় করছে, তবে এর ফলে দিল্লি-ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।

PostImage

ভারত থেকে ধীরে ধীরে ‘সক্রিয় রাজনীতিতে’ ফিরছেন শেখ হাসিনা


প্রায় ন’মাস ধরে ভারতে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। শুরুতে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নীরব ও সীমিত যোগাযোগে, কিন্তু এখন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ও দলীয় পর্যায়ে তার রাজনৈতিক উপস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে। এতে যেমন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

‘মুখ খোলা’ শেখ হাসিনা – নতুন রাজনৈতিক পর্বের সূচনা

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলেছে,  ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ভাঙচুরের পর শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা শুরু হয়। ঢাকার পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাগাতার মিথ্যা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।

প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ঢাকা, আর পরদিনই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা জানায় — শেখ হাসিনা “ব্যক্তিগত সক্ষমতায়” কথা বলছেন, ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই।

তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে ভারত সরকারের নীরব সম্মতিতে হয়েছে, তা এখন আর গোপন নেই।

ভারতের ‘আনলকিং’ নীতি: ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা

ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর শেখ হাসিনা প্রথম কয়েক মাস ছিলেন কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে। কোনো মিডিয়া সাক্ষাৎকার বা সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন সেই নিষেধাজ্ঞাগুলো একে একে তুলে নেওয়া হচ্ছে — বিশ্লেষকরা যাকে বলছেন, “হাসিনা আনলকিং প্রক্রিয়া।”

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি একাধিকবার অনলাইনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন — কখনো রেকর্ডেড, কখনো সরাসরি ‘লাইভ’। এমনকি গত ২৯ অক্টোবর তিনটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম — রয়টার্স, এএফপি এবং দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট — একযোগে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে।

এরও আগে ভারতে থাকা পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছে, যা ভারতের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।

‘আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক রাখার কৌশল’

দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রতিরক্ষা গবেষক ড. স্মৃতি পট্টনায়ক মনে করেন, শেখ হাসিনাকে এখন সক্রিয়ভাবে বক্তব্য দিতে দেওয়া হচ্ছে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে “প্রাসঙ্গিক” রাখার জন্য।

তার ভাষায়, “বাংলাদেশে একটার পর একটা বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ হচ্ছে — নির্বাচন কমিশন সংস্কার, জুলাই সনদ — কিন্তু আওয়ামী লীগের কোনো ভূমিকা নেই। অথচ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি, যার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই শেখ হাসিনাকে মুখ খুলতে দেওয়া হচ্ছে যেন দলটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত না হয়ে যায়।”

ভারতের কৌশল: হাসিনার মাধ্যমে ‘পাল্টা চাপ’

জেএনইউর সাবেক অধ্যাপক বলদাস ঘোষালের মতে, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার ও বার্তাগুলোর মাধ্যমে ভারত আসলে বাংলাদেশের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করছে।

তার মতে, “ভারত সরাসরি যা বলতে পারে না, তা এখন শেখ হাসিনার মুখ দিয়েই বলানো হচ্ছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তাদের সফর, কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য – এসবের পর ভারত মনে করছে, ঢাকা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই শেখ হাসিনার মাধ্যমে তারা বার্তা দিচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও ভারত এখনো একে অপরের পাশে আছে।”

দলীয় কর্মীদের কাছে ‘আশার প্রতীক’ হয়ে উঠছেন হাসিনা

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য মনোবল ফেরানোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়, “দলটির অনেক শীর্ষ নেতা এখন দেশছাড়া, নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। এমন অবস্থায় শেখ হাসিনার অনলাইন বার্তা তাদের সংগঠিত করছে, উৎসাহ দিচ্ছে। ভারতও এই প্রক্রিয়াকে নীরবে অনুমোদন দিয়েছে।”


শেখ হাসিনার নিয়মিত বার্তা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে ভারতে সরাসরি সাক্ষাৎ — সব মিলিয়ে এখন আওয়ামী লীগের ঘরানার রাজনীতি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নতুনভাবে মাঠে নামার সুযোগ পেতে পারে।

তবে এর ফলে দিল্লি-ঢাকার সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে, কারণ বাংলাদেশ সরকার এখনও শেখ হাসিনাকে “জুলাই গণহত্যার অভিযুক্ত” হিসেবে বিচার মুখোমুখি করার দাবি জানিয়ে রেখেছে।


ভারতে ‘নিরাপদ আশ্রয়’-এ থাকা শেখ হাসিনা এখন আর নিস্ক্রিয় নন। অনলাইন ভাষণ, আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকার ও দলীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছেন
এতে যেমন আওয়ামী লীগের মধ্যে পুনরুজ্জীবন ঘটছে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রেও নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।



সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর