সৌদি আরব থেকে এশিয়ার বাজারে প্রায় দশ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহ

এশিয়ার অর্থনীতি সচল রাখতে বিশ্ববাজারের চাহিদা মেনে বিশাল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে সৌদি তেল কোম্পানিগুলো।

সৌদি আরব থেকে এশিয়ার বাজারে প্রায় দশ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহ

সৌদি আরব থেকে এশিয়ার বাজারে প্রায় দশ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহ


বিশ্বের জ্বালানি বাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক এবং শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব এশীয় অঞ্চলে তাদের বাণিজ্য আরও প্রসারিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব প্রায় দশ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে জাহাজীকরণ করেছে। বিগত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে এই বিশাল পরিমাণ তেল রপ্তানির কাজ শুরু হয় এবং বর্তমানে তা নির্ধারিত গন্তব্যগুলোর দিকে পৌঁছাতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাজার পর্যবেক্ষণকারী বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলো মনে করছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও এশীয় অঞ্চলে জ্বালানির চাহিদা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। এই বিশাল চালানের মাধ্যমে সৌদি আরব এশিয়ার দেশগুলোতে নিজেদের আধিপত্য আরও শক্তিশালী করল।  


এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই তাদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি থেকে আমদানি করে আসছে। সম্প্রতি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদির পক্ষ থেকে এই বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহের ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে বলে আশা প্রকাশ করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। ওপেক প্লাস জোটের পূর্বনির্ধারিত উৎপাদন নীতি এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্যের ওঠানামার মধ্যেই সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের এই বিপণন প্রক্রিয়া সচল রেখেছে।


ব্লুমবার্গের দেওয়া তথ্যানুসারে, সমুদ্রপথে চলাচলকারী বিশাল আকৃতির বিশাল তেলের ট্যাংকারগুলোর মাধ্যমে এই তেল পরিবহনের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। সাধারণত এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী এবং বিশাল চালানের ক্ষেত্রগুলোতে পূর্বেই চুক্তিবদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বিশেষায়িত আধুনিক টার্মিনাল ও বন্দর থেকে এসব বিশালাকার তেলবাহী জাহাজ এশিয়ার বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশের প্রধান প্রধান শোধনাগারগুলোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার শিল্প উৎপাদন খাতে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির ব্যাপক চাহিদা দেখা দেওয়ায় এসব দেশের সরকার ও শোধনাগার কোম্পানিগুলো নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সাথে আমদানি বাণিজ্য বজায় রাখছে।  


জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন রুটে সমুদ্রপথের বাণিজ্যে বাধার মুখেও সৌদি আরব তাদের সরবরাহের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এই তেল সরবরাহের ঘটনাটি বেশ কয়েকটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে এশিয়ার জ্বালানি বাজারে চাহিদার ঘাটতি হয়নি বরং দিন দিন তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার তেল বাণিজ্যের নানা আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে সৌদির এমন বড় সরবরাহ বিশ্ববাজারকে অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত রাখবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করে লাফিয়ে বাড়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।


সৌদি আরামকো তাদের প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শোধনাগারগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব জোরদার করার ফলে এখন খুব সহজেই বড় আকারের চালান নিশ্চিত করতে পারে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব বা নবায়নযোগ্য শক্তির আলোচনা জোরদার হলেও পরিবহন খাত ও ভারি শিল্পে অপরিশোধিত তেলের ব্যবহার এখনও অত্যন্ত বেশি। আগামী দিনগুলোতেও এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে তেলের চাহিদা কমবে না বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সৌদি আরব থেকে পাঠানো এই ১০ কোটি ব্যারেল তেলের বড় একটি অংশ যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খাতের জ্বালানি সরবরাহ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য।  
সৌদি আরবের মতো বড় উৎপাদক রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে নিয়মিত তেল সরবরাহ আন্তর্জাতিক শিল্প বাণিজ্য এবং উৎপাদন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এশীয় দেশগুলো বিশেষ করে ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং শিল্প কারখানার চাকা সচল রাখার জন্য এই ধরনের বড় তেল সরবরাহ অতীব জরুরি। এই বিশাল পরিমাণ তেল দ্রুত সময়ে রপ্তানি করতে পারাকে সৌদি জ্বালানি খাতের একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর ফলে এশিয়ার বাজারে তাদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্ক যেমন জোরদার হলো, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের ধারাবাহিক জোগান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানও আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠলো।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর