তিন মাসে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দামে বড় উত্থান, বাংলাদেশে ২০ টাকা বৃদ্ধি কেন?
বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে পাম্পের দামে
তিন মাসে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দামে বড় উত্থান, বাংলাদেশে ২০ টাকা বৃদ্ধি কেন?
বিশ্বের জ্বালানি বাজারে গত তিন মাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের খুচরা বাজারেও পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। তবে সব দেশে পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, আবার কোথাও দাম কমেছে বা সরকার মূল্য স্থিতিশীল রেখেছে।
GlobalPetrolPrices-এর ১৭৫ দেশের তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জুন থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিশ্ব গড়ে পেট্রোলের দাম ১৫.৩২ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে Brent crude-এর দাম ৭৯.৭১ ডলার থেকে ১০৮.০৬ ডলারে উঠেছে।
নরওয়ে, আফগানিস্তান ও তুরস্কে বড় মূল্যবৃদ্ধি
তিন মাসের হিসাবে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান, নরওয়ে ও তুরস্ক।
আফগানিস্তানে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ৩৩.৮ শতাংশ। নরওয়েতে বেড়েছে ৪৩.১ শতাংশ। ১৪ সেপ্টেম্বর নরওয়েতে পেট্রোলের দাম ছিল ২৯.৫৬ নরওয়েজিয়ান ক্রোন প্রতি লিটার, যেখানে তিন মাস আগে ছিল ২০.৬৫ ক্রোন। অর্থাৎ লিটারপ্রতি ৮.৯১ ক্রোনের বৃদ্ধি।
তুরস্কেও পেট্রোলের দাম তিন মাসে ২৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পোল্যান্ডে বৃদ্ধি ৩১ শতাংশের বেশি। জার্মানি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সেও উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
ডিজেলের ক্ষেত্রে নরওয়ে, তুরস্ক, পোল্যান্ড ও আফগানিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশে বড় বৃদ্ধি দেখা গেছে। পাকিস্তানেও ডিজেলের দাম তিন মাসে ৩৩.৫ শতাংশ বেড়ে ৩১১.৪৭ থেকে ৪১৫.৮৩ পাকিস্তানি রুপিতে উঠেছে।
ইউরোপে এক মাসেই ডিজেল বেড়েছে ৮.৩ শতাংশ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক তথ্যও বৈশ্বিক চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করছে।
Eurostat-এর আগস্ট ২০২৬-এর হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে EU-তে ব্যক্তিগত পরিবহনের জ্বালানি ও লুব্রিকেন্টের দাম ২৩.৮ শতাংশ বেড়েছে। শুধু জুলাই থেকে আগস্টের এক মাসে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৮.৩ শতাংশ এবং পেট্রোল ৩.৩ শতাংশ। ২৭টি EU দেশের মধ্যে ২৬টিতেই ওই এক মাসে ডিজেলের দাম বেড়েছে।
বার্ষিক হিসাবে আগস্টে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি ছিল বুলগেরিয়ায় ৩৪.৫ শতাংশ, লিথুয়ানিয়ায় ২৮.৮ শতাংশ, ফিনল্যান্ডে ২৭.৬ শতাংশ, জার্মানিতে ২৭.৫ শতাংশ এবং ফ্রান্সে ২৭.৪ শতাংশ।
এশিয়ায় চিত্র এক রকম নয়
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পরিস্থিতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের হিসাবে পেট্রোলের দাম বরং ২.৪ শতাংশ কম ছিল। তবে ২১ সেপ্টেম্বরের নতুন ডেটায় তিন মাসের হিসাবে পেট্রোলের বৃদ্ধি ১২.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ তারিখ পরিবর্তনের সঙ্গে তথ্যও পরিবর্তিত হয়েছে।
চীনে তিন মাসের হিসাবে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম সামান্য কম ছিল। ভারতে একই সময়ে খুচরা দাম প্রায় স্থির ছিল। শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও তিন মাসের হিসাবে জ্বালানি বাজারে বড় উত্থান দেখা যায়নি।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও প্রতিটি দেশের ভোক্তা একই হারে সেই চাপ বহন করছে না। কোথাও সরকার কর, ভর্তুকি বা মূল্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাম ধরে রাখছে, আবার কোথাও বাজারমূল্যের বড় অংশ সরাসরি ভোক্তার ওপর যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী হয়েছে?
বাংলাদেশে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চারটি জ্বালানির দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা।
ডিজেলের ক্ষেত্রে এই একবারের বৃদ্ধি প্রায় ১৭.৪ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু এই ২০ টাকার অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তেলের মূল্য ছাড়াও ডলার বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, বীমা, পরিবহন ব্যয়, কর এবং ভর্তুকির বিষয়ও চূড়ান্ত খুচরা মূল্যে প্রভাব ফেলে।
সরকার কেন দাম বাড়ানোর কথা বলছে?
জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের ব্যাখ্যায় সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রির কারণে সীমান্তপথে চোরাচালানের ঝুঁকিও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করলে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম প্রায় ২০৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারত। সর্বশেষ ১৩৫ টাকা নির্ধারণের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা সমপরিমাণ ভর্তুকি বা মূল্যঘাটতি বহন করা হচ্ছে বলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক চাপের কথাও সরকার তুলে ধরেছে। ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতির পরিমাণ ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা হয়েছে বলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে।
তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান কী?
বাংলাদেশের সর্বশেষ ২০ টাকা বৃদ্ধিকে তিন মাসের আন্তর্জাতিক শতাংশের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ বাংলাদেশের ২০ টাকা হলো সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখে নেওয়া একটি এককালীন খুচরা মূল্য সমন্বয়, আর আন্তর্জাতিক তুলনার ১৫.৩২ শতাংশ ও ২০ শতাংশ হলো ১৫ জুন থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পেট্রোল ও ডিজেলের বিশ্ব গড় পরিবর্তন।
তারপরও তুলনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি শুধু বাংলাদেশের ঘটনা নয়। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলের বহু বাজারে গত কয়েক মাসে জ্বালানির দাম বেড়েছে। কোনো দেশে সরকার বেশি অংশ ভর্তুকি দিয়ে মূল্য আটকে রেখেছে, কোনো দেশে বাজারদরের বড় অংশ ভোক্তার ওপর পড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব আমদানি ব্যয়, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই পৌঁছাতে পারে।
সামনে বড় প্রশ্ন মূল্য নয়, স্থিতিশীলতা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের পরিবহন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করে দীর্ঘদিন বড় ভর্তুকি বহন করাও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন শুধু জ্বালানির দাম কত হলো, তা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশে কত দ্রুত তার সুফল দেওয়া হবে, দাম বাড়লে কতটা সমন্বয় করা হবে, ভর্তুকির বোঝা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষ ও উৎপাদন খাতের ওপর কীভাবে কমানো হবে—সেই নীতিগত ভারসাম্যই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের সর্বশেষ তিন মাসের তথ্য অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করছে—জ্বালানি তেলের মূল্যচাপ একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা; তবে সেই চাপ জনগণের ওপর কতটা যাবে, সেটি প্রতিটি দেশের মূল্যনীতি, ভর্তুকি ও বাজারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে।