একই মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে ড্রোন চুক্তি ভারত-পাকিস্তানের

একই মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ড্রোন প্রযুক্তি নিচ্ছে ভারত-পাকিস্তান, ট্রাম্পপুত্রের বিনিয়োগ ও ইসরায়েলি যোগসূত্র ঘিরে উঠছে নতুন প্রশ্ন?

একই মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে ড্রোন চুক্তি ভারত-পাকিস্তানের

একই মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে ড্রোন চুক্তি ভারত-পাকিস্তানের


দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান এবার একই মার্কিন ড্রোন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্ত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্পের বিনিয়োগ থাকা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারাস (পাওয়ারাস)-এর কাছ থেকে ড্রোন ব্যবস্থা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। একই প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস আগেই ভারতের একটি প্রতিরক্ষা কোম্পানিকে নিজেদের ড্রোন-প্রতিরোধী প্রযুক্তি উৎপাদন ও বিক্রির একচ্ছত্র লাইসেন্স দিয়েছে। 

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ সেপ্টেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তরে পাওয়ারাস ও ইসলামাবাদে মার্কিন দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের বৈঠক হয়। পরদিন প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের কাছ থেকে মানববিহীন আকাশযান ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সহায়তার জন্য একটি সীমিত ক্রয়াদেশ দিয়েছে। 

একই সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে পাওয়ারাস। তবে প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট করেছে, এই সমঝোতা স্মারক কোনো চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি নয় এবং এর মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর ভবিষ্যতে পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়নি। ভবিষ্যতের যেকোনো প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের আইন, সরকারি অনুমোদন ও পৃথক চুক্তির ওপর নির্ভর করবে। ক্রয়াদেশটির আর্থিক মূল্য এবং ঠিক কোন ড্রোন ব্যবস্থা পাকিস্তান পাচ্ছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। 

বিষয়টিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে ভারতের সঙ্গে পাওয়ারাসের আগে থেকেই থাকা সম্পর্ক। আল জাজিরা জানিয়েছে, গত ৩০ জুন ভারতের প্যারাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস টেকনোলজিস জানায়, পাওয়ারাস তাদের ‘গার্ডিয়ান-১’ ড্রোন ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি ভারতে তৈরি ও বিক্রির একচ্ছত্র লাইসেন্স দিয়েছে। অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রতিরক্ষা খাতেই একই মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি প্রবেশ করছে। 

পাওয়ারাসের সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাওয়ারাসে বিনিয়োগ করেছেন। তবে পাওয়ারাস বলেছে, ট্রাম্পের দুই ছেলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা পালন করেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের একজন মুখপাত্রও তাঁকে ‘প্যাসিভ ইনভেস্টর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে আগে থেকে তাঁর জানা ছিল না। হোয়াইট হাউসও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। 

আরেকটি সংবেদনশীল বিষয় হলো পাওয়ারাসের ইসরায়েলি যোগসূত্র। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিভ মারোম (জিভ মারোম) ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য। অন্যদিকে পাকিস্তান এখনো ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন তুলেছে বলে আল জাজিরাকে কয়েকজন বিশ্লেষক জানিয়েছেন। 

পাকিস্তানের জন্য পাওয়ারাসই অবশ্য প্রথম বা একমাত্র ড্রোন প্রযুক্তির উৎস নয়। দেশটির বিমানবাহিনীর কাছে তুরস্কের বায়রাকতার টিবি২ ও আকিনজি, চীনের উইং লুং-২ এবং নিজস্বভাবে তৈরি শাহপার-২ ড্রোন রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে আল জাজিরা জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। 

বিশ্লেষকদের মধ্যে পাকিস্তানের সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য নিয়েও ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত ইলেকট্রনিকস, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ও ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা এর পেছনে থাকতে পারে। আবার কেউ মনে করছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করা এবং পাকিস্তানের ড্রোন খাতে মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণও একটি উদ্দেশ্য হতে পারে। এগুলো বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন—পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথা বলেনি। 

ফলে পাওয়ারাসকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের এই সমান্তরাল সম্পর্ক শুধু ড্রোন কেনাবেচার বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ট্রাম্প পরিবারের বিনিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে সাবেক ইসরায়েলি সেনাসদস্যের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর