ভিসা জটিলতায় যুক্তরাষ্ট্রবিমুখ বিদেশি শিক্ষার্থীরা, অর্ধেকের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমেছে আবেদন
ভিসা অনিশ্চয়তায় যুক্তরাষ্ট্রবিমুখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা, অর্ধেকের বেশি মার্কিন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কমেছে আবেদন, উচ্চশিক্ষা খাতে বাড়ছে নতুন উদ্বেগ ও আর্থিক চাপ।
ভিসা জটিলতায় যুক্তরাষ্ট্রবিমুখ বিদেশি শিক্ষার্থীরা, অর্ধেকের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমেছে আবেদন
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে দীর্ঘদিনের অন্যতম জনপ্রিয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে এবার উদ্বেগজনক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ভিসা পেতে বিলম্ব, আবেদন প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা এবং অভিবাসন নীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদন কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশনের সাম্প্রতিক ‘পালস পয়েন্ট’ জরিপের বরাতে ১৮ সেপ্টেম্বর এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
জরিপে অংশ নেওয়া উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতাদের মতে, পরিবর্তনশীল কেন্দ্রীয় অভিবাসন নীতি, ভিসা প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাঠানো দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থী সংগ্রহের ক্ষেত্রে চাপ অনুভব করছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্য হঠাৎ তৈরি হয়নি। আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শরৎকালেই যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি ১৭ শতাংশ কমেছিল। যেসব প্রতিষ্ঠান নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী কমার কথা জানিয়েছিল, তাদের ৯৬ শতাংশ ভিসা আবেদনসংক্রান্ত উদ্বেগ—যার মধ্যে বিলম্ব ও প্রত্যাখ্যান রয়েছে—প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। পাশাপাশি ৬৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ বিধিনিষেধকেও একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্বেগের আরেকটি বড় জায়গা হলো অভিবাসন বিধির পরিবর্তন। এ বছরও আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশনসহ ৩২টি উচ্চশিক্ষা সংগঠন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে শরৎকালীন সেমিস্টারের আগে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ভিসা প্রক্রিয়াকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, ভিসা পেতে দেরি হলে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারবেন না এবং শেষ পর্যন্ত অন্য দেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের উচ্চতর শিক্ষায় বিদেশি শিক্ষার্থীর প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশন বলেছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ক্ষেত্রে ভিসা জট, বাড়তি যাচাই এবং সামগ্রিক অভিবাসন-অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক মেধা আকর্ষণের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও অর্থ ব্যয় করেন। আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশনের ফেব্রুয়ারির হিসাবে, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির পতনের কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে আনুমানিক ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং প্রায় ২৩ হাজার চাকরির সমপরিমাণ প্রভাব পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগের জরিপে বিদেশি শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭১ শতাংশ বেশি সক্রিয় নিয়োগ কার্যক্রম এবং ৫৪ শতাংশ ভর্তি নিশ্চিত হওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোকে কার্যকর কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছিল। একই জরিপে ৮৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংগ্রহকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেছে।
বাংলাদেশসহ যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতিটির অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থী ভিসা পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বরং বর্তমান তথ্য বলছে, ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সময়, প্রয়োজনীয় যাচাই এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তন সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তনও ঘটেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘদিনের ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি নতুন বিধি ফেডারেল আদালত সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নীতিগত পরিবেশ এখনও পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন বিষয় আদালতের বিচারাধীন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আস্থা ধরে রাখা, অন্যদিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিসা ও অভিবাসন বিধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। নতুন জরিপে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন কমার তথ্য সেই চাপেরই নতুন ইঙ্গিত।