বিডার নেতৃত্বে বিনিয়োগ সমন্বয়ে ঐক্যবদ্ধ সব সংস্থা — বাস্তব ফলাফলের পথে দেশ
৫ম বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির বৈঠকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি: বিনিয়োগে ডিজিটাল রূপান্তর, স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিতের পথে বাংলাদেশ
বিডার নেতৃত্বে বিনিয়োগ সমন্বয়ে ঐক্যবদ্ধ সব সংস্থা — বাস্তব ফলাফলের পথে দেশ
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ও ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজীকরণে সরকার ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিশেষ দূত লতফি সিদ্দিকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৫ম বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এসব অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
লতফি সিদ্দিকি বলেন,
> “এই বৈঠকে আমরা বাস্তবায়ন ও পারস্পরিক জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। এটি আমাদের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ বাকি, কিন্তু আমরা সুস্পষ্ট লক্ষ্য, দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছি।”
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মন্সুর, প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তাইয়েব, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, বিভিন্ন সচিব এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা।
---
বিনামূল্যে আমদানি (FOC) নীতির সংশোধন: রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে একমত হয়েছে যে ১০০% রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য Free of Charge (FOC) আমদানিতে কোটার বিধান বাতিল করা হবে। সংশোধিত আমদানি নীতিমালা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে জারি করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই সংস্কারের ফলে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ইনভেন্টরি ব্যয় কমাতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, নীতিটি নিঃশর্তভাবে বাস্তবায়িত হলে বহু বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
---
ডিজিটাল অবকাঠামোতে বড় সাফল্য: বাংলাদেশ বিজনেস পোর্টাল
বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশ বিজনেস পোর্টাল-এর প্রথম ধাপ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সফলভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একীভূত ডিজিটাল গেটওয়ে হিসেবে কাজ করছে।
এর দ্বিতীয় ধাপ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে সম্পন্ন হবে, যেখানে যুক্ত হবে “Business Starter Package” ও “Single Sign-On” ফিচার। ফলে ২৯টি সরকারি সেবা একক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
এই সিস্টেমটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো (BSW), ASYCUDA, ও Customs Bond Management System (CBMS)-এর সঙ্গে তথ্য সংযোগ স্থাপন করবে, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিপ্লব আনবে।
এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ডিজিটাল গভর্নেন্স রোডম্যাপের অংশ, যার লক্ষ্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় ও জটিলতা কমিয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
---
চট্টগ্রাম বন্দরে আধুনিকায়ন: পোর্ট ব্যবস্থাপনায় গতি
চট্টগ্রাম বন্দরে বড় ধরনের আধুনিকায়ন প্রকল্প চলছে।
লালদিয়া ইয়ার্ড ও তালতলা কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণাধীন রয়েছে।
তালতলার ৬.২৫ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত নতুন ইয়ার্ডটি ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পগুলো কনটেইনার জট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে ৬,০০০টিরও বেশি কনটেইনার খালাসের কাজ চলছে, যার মধ্যে ৪০৩টি বিশেষ নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য অপসারণে একটি সাত সদস্যবিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, Automated Risk Management Software (ARMS)-এর API ইনস্টলেশন চলছে, যা ডেটা-ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে কার্গো পরিদর্শনকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করবে।
এছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন সরাসরি এনবিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে, যা পূর্বে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করতে হতো। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হচ্ছে।
---
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার
বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বন্দর এলাকায় RTGS সেবা চালু করেছে এবং ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রপ্তানি-আমদানি পেমেন্ট প্রক্রিয়া সহজ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল ফ্লোচার্ট তৈরি করছে, যা অনলাইনে প্রকাশ করা হবে।
একই সঙ্গে, আমদানি অগ্রিম অর্থপ্রদানের সীমা, Export Retention Quota (ERQ)-এর নমনীয়তা এবং ডলার স্থানান্তর নীতি পর্যালোচনা চলছে। এসব সংস্কার রপ্তানিমুখী শিল্পের কার্যকর মূলধন ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা রাখবে।
---
ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিংয়ে সহজীকরণ
ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনে উদ্যোক্তাদের জন্য একক প্রবেশপথ (Single Entry Point) চালু করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ এই সিস্টেমটি সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
এছাড়া ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের মেয়াদ এক বছর থেকে পাঁচ বছর করা হয়েছে।
---
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) কাঠামোর অগ্রগতি
বড় অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ভাগাভাগির জন্য PPP মডেল বাস্তবায়নের জাতীয় কৌশল প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে। স্টেকহোল্ডার পরামর্শ শেষে এটি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হবে।
এই কাঠামো বাংলাদেশের অবকাঠামো বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থায়নের পথ খুলে দেবে।
---
বিনিয়োগ পাইপলাইন ও স্বচ্ছতা ব্যবস্থাপনা
এখন থেকে সব বিনিয়োগ সংস্থা মাসিকভাবে তাদের প্রকল্পের তথ্য বিডায় জমা দেবে, যাতে দেশভিত্তিক বিনিয়োগ প্রবণতা, বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগের অনুপাত এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিশ্লেষণ করা যায়।
বিডা এসব তথ্য বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটিকে উপস্থাপন করে, যাতে দ্রুত ও প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
---
পরিবেশগত ভারসাম্য ও টেকসই বিনিয়োগ
বিডা, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন অধিদপ্তর যৌথভাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কার্বন ট্রেডিং ও বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে একটি কর্মশালা আয়োজন করবে।
এর লক্ষ্য হলো জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগানো ও বিনিয়োগ টেকসই হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SME) সহায়তা
এসএমই খাতে কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবন বাড়াতে সরকার বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে—
অনলাইন মার্কেটপ্লেস উন্নয়ন,
ব্যাংক-নির্ভর বৈদেশিক পেমেন্ট গ্রহণ,
এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিশেষ সহায়তা।
এসএমই খাতকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
---
সারসংক্ষেপ
বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে সরকারের মূল কৌশল এখন ডিজিটালাইজেশন, প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।
বর্তমানে এনবিআরের ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (NSW) ইতিমধ্যে ৬ লাখেরও বেশি পারমিট ইস্যু করেছে, যার অধিকাংশই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন, ফলে প্রায় ১২ লক্ষ সরকারি দপ্তরে শারীরিক ভিজিট সাশ্রয় হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এই সংস্কারগুলো বাংলাদেশের বিনিয়োগ কাঠামোকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলছে — “Ease of Doing Business”-এর বাস্তব রূপায়ণ এখন দৃশ্যমান।