গুমবিরোধী কণ্ঠ থেকে প্রার্থীতা— বিএনপির নতুন বার্তা মানবাধিকারের পক্ষে
বিএনপির মাস্টার স্ট্রোক: ঢাকা-১৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী সানজিদা তুলি
গুমবিরোধী কণ্ঠ থেকে প্রার্থীতা— বিএনপির নতুন বার্তা মানবাধিকারের পক্ষে
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক দেখালো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১৪ আসনে (গাবতলী-কল্যাণপুর-দারুসসালাম) ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে বিএনপি প্রার্থী করছে মানবাধিকার আন্দোলনের পরিচিত মুখ সানজিদা ইসলাম তুলিকে।
তুলি দীর্ঘদিন ধরে ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, যা গুম পরিবারের স্বজনদের নিয়ে গঠিত একটি মানবাধিকার প্ল্যাটফর্ম। তিনি শুধু সংগঠকই নন, বরং গুমের শিকার পরিবারের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব এক সাহসী কণ্ঠ।
✦ গুম পরিবারের এক সদস্য থেকে জননেত্রীতে উত্তরণ
সানজিদা তুলির ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৩৮ (বর্তমান ২৫) নং ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তিনি নিখোঁজ হন, যার পর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনাই তুলির জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ভাইয়ের খোঁজে পথে নামা তুলি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন গুমবিরোধী আন্দোলনের প্রতীকী মুখ।
তিনি জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলসহ নানা আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন। তার নেতৃত্বে ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনটি বাংলাদেশের গুমের শিকার পরিবারের আওয়াজ আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
✦ জামায়াতের আরমান বনাম বিএনপির তুলি
একই আসনে আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী করেছে ব্যারিস্টার আরমানকে, যিনি নিজেও এক সময় গুমের শিকার হয়ে “আয়নাঘর” নামে পরিচিত কারাগারে দীর্ঘদিন ছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সিদ্ধান্তটি শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং কৌশলগতও বটে।
দলটির একাধিক সূত্র জানায়, “ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণার পর বিএনপি অনেক চিন্তাভাবনা করেই তুলিকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেয়। এখানে শুধু দলের প্রার্থী নয়, বরং ইস্যুভিত্তিক বার্তাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
✦ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে কৌশলগত পদক্ষেপ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বিএনপির একটি “মাস্টার স্ট্রোক” —
একদিকে গুম ও মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত এক নারীর প্রার্থিতা দিয়ে তারা মানবাধিকারের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির তুলনায় মানবিক ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
একজন জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা বলেন—আমরা এবার প্রার্থী বাছাই করছি পরিস্থিতি অনুযায়ী। যে আসনে যিনি ফিট, তাকেই প্রার্থী করা হচ্ছে—তিনি দলের নিয়মিত রাজনীতিক হোন বা আন্দোলনের ফ্রন্টলাইন কর্মী। গুম ও মানবাধিকার ইস্যু আমাদের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের অংশ, তাই তুলিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”
✦ মাঠে নেমে পড়েছেন নেতাকর্মীরা
ঢাকা-১৪ আসনে তুলির প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়েছেন।
গাবতলী থেকে দারুসসালাম পর্যন্ত এলাকাজুড়ে পোস্টার-ব্যানার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও তুলির প্রার্থিতা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
এক তরুণ কর্মী বলেন—
> “তুলি আপা শুধু রাজনীতির প্রার্থী নন, তিনি একজন সংগ্রামী বোন। তার মতো মানুষ সংসদে গেলে আমাদের কথা কেউ না কেউ বলবে।”
✦ সামনে কী?
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনটি এখন বিএনপি ও জামায়াতের পারস্পরিক কৌশল এবং মানবাধিকার বার্তার প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তুলির প্রার্থিতা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গুমবিরোধী আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায়ও বটে।