সৌদির তেলপথে ড্রোন হামলা, হরমুজের বিকল্প নিয়েও দেখা দিল বড় প্রশ্ন?
হরমুজের বিকল্প সৌদি তেলপথেও ড্রোন হামলা, বন্ধ পাইপলাইন—বাড়ল বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ।
সৌদির তেলপথে ড্রোন হামলা, হরমুজের বিকল্প নিয়েও দেখা দিল বড় প্রশ্ন?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে এবার সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। হামলার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনকে লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি সরকারের দাবি, ড্রোনগুলো ইরাক থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজ চলছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিরাপত্তার স্বার্থে পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই পাইপলাইন সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। পাইপলাইনটির সর্বোচ্চ পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল দৈনিক।
এই পাইপলাইনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতির কারণে। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে তেল সরাসরি পারস্য উপসাগর হয়ে জাহাজে তুলতে গেলে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন সৌদি তেলকে দেশটির পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সেখান থেকে তেল লোহিত সাগরের পথে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব।
অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের অবরোধ, সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় বাধা তৈরি হলে এই পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করে। এ কারণেই সাম্প্রতিক হামলাকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির মতো করে বলা ঠিক হবে না যে হামলার কারণে একসঙ্গে ৭০ লাখ ব্যারেল তেল প্রতিদিন পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। ৭০ লাখ ব্যারেল হলো পাইপলাইনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা। বাস্তবে হামলার আগে এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এদিকে হামলার উৎস নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সৌদি সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোন ইরাক থেকে এসেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি যে একই হামলায় ইরাক ও ইয়েমেন—উভয় দিক থেকেই প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল। ফলে হামলাটিকে ‘ইরাক অথবা ইয়েমেন থেকে’ হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে লেখা বিভ্রান্তিকর হবে।
ঘটনার সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি পরিস্থিতির অবশ্যই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগসূত্র রয়েছে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। তারা কৌশলগত মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এর ফলে সৌদি আরবের তেল পরিবহনের পূর্ব ও পশ্চিম—দুই বিকল্প পথই নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন হামলার পর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপর চাপ আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে তেলের দামের ওপরও পড়েছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারের ওপরে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম টেক্সাস মধ্যবর্তী তেলের দামও ১০০ ডলারের কাছাকাছি বা তার ওপরে উঠে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহপথে আরও হামলা হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
ইরাকের পক্ষ থেকেও হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, ইরাকের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হামলার বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সৌদি আরবও আপাতত পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থাও এখন আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটিতেও হামলা হলে সৌদি আরবের রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর চাপ আরও বাড়ে।
তবে এটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না যে হরমুজ প্রণালির কোনো বিকল্পই নেই। সৌদি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য স্থলভিত্তিক অবকাঠামো হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার সক্ষমতা সীমিত এবং সেগুলোও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল।
এ কারণেই সাম্প্রতিক হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ঝুঁকিতে পড়ার পর যদি বিকল্প স্থলপথেও হামলা হয়, তাহলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।