শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ স্কুলের প্রতিবাদে ফ্রান্সে টানা তিন সপ্তাহের শিক্ষার্থী বিক্ষোভ

শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ও অতিরিক্ত ভিড়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ তীব্র হয়েছে; বাড়ছে সংঘর্ষ, আটক ও আহতের সংখ্যা।

শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ স্কুলের প্রতিবাদে ফ্রান্সে টানা তিন সপ্তাহের শিক্ষার্থী বিক্ষোভ

শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ স্কুলের প্রতিবাদে ফ্রান্সে টানা তিন সপ্তাহের শিক্ষার্থী বিক্ষোভ


ফ্রান্সে শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সমস্যার প্রতিবাদে টানা তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের একটি উপশহর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষা-কর্মীরাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন।

আন্দোলনকারীদের প্রধান অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, দীর্ঘ কর্মদিবস এবং পুরোনো ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবন। গরমের সময় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে।

বিক্ষোভের অনেক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। কোথাও স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করা হয়েছে, আবার কোথাও আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ফরাসি সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

উত্তরাঞ্চলীয় লঁস শহরে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত ও হাতের নিচের অংশ গুরুতরভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পুলিশ ব্যবহৃত একটি বিস্ফোরক গ্রেনেডের সঙ্গে ওই কিশোরের সংস্পর্শ কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনাটি পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ১৯০ শিক্ষার্থী এবং ৭৮ জন শিক্ষা-কর্মী আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। পুলিশের মধ্যেও বিপুলসংখ্যক সদস্য আহত হয়েছেন বলে পরবর্তী সরকারি হিসাবে জানানো হয়েছে।

বিক্ষোভের প্রভাবে কয়েক শ উচ্চবিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ বা আংশিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ৫ অক্টোবর প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি উচ্চবিদ্যালয়ে নিরাপত্তাজনিত কারণে ক্লাস পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরবর্তী হিসাবে আন্দোলনের প্রভাবে ৫৮৯টি বিদ্যালয় কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হওয়ার কথা জানানো হয়।

আন্দোলন-সংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনায় আটকের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৫,০৬০ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। একই হিসাবে ১,৮০২ জনের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার মধ্যে ১,৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগ নিয়েও মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অধিকারকর্মীরা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতা ও সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনাও তুলে ধরেছে। ফলে পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ফরাসি সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও তাদের প্রস্তাব জানতে জাতীয় পর্যায়ে পরামর্শ কার্যক্রম শুরু করেছে। স্কুলে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা, ভবনের অবকাঠামো উন্নয়ন, স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করার মতো বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের ইউনিয়নগুলো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের শিক্ষা-সংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান, অন্যদিকে সহিংসতা ও সম্পত্তি ধ্বংস ঠেকানো—দুই দিক সামলাতে হচ্ছে ফরাসি সরকারকে।

ফ্রান্সের চলমান এই আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং পুলিশের আচরণ—সবকিছু নিয়েই বড় ধরনের জাতীয় বিতর্ক তৈরি করেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর