মৃত্যুর মুহূর্তে একা স্ত্রী, খবর শুনেই হাসপাতাল ছেড়ে পালালেন স্বামী

স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন স্বামী, মৃত ঘোষণার পরই পালানোর চেষ্টা, স্থানীয়দের হাতে আটক হয়ে গেলেন তিনি অবশেষে।

মৃত্যুর মুহূর্তে একা স্ত্রী, খবর শুনেই হাসপাতাল ছেড়ে পালালেন স্বামী

মৃত্যুর মুহূর্তে একা স্ত্রী, খবর শুনেই হাসপাতাল ছেড়ে পালালেন স্বামী


গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে মুমূর্ষু স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করতেই দ্রুত সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেছেন তাঁর স্বামী। পরে নিজ এলাকায় যাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে তাঁকে হেফাজতে নেয়।


ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অভিযুক্ত স্বামীর নাম মোরসেলিম আকাশ সিয়াম। তাঁর স্ত্রী শাহিনা আক্তারের বয়স ২২ বছর। তিনি পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে এখন হত্যা-অভিযোগের তদন্ত চলছে।


পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে সিয়াম নিজেই একটি ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে তাঁর স্ত্রী শাহিনাকে মুমূর্ষু অবস্থায় পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শাহিনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং হৃদ্‌যন্ত্রের পরীক্ষা করার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

চিকিৎসক স্ত্রীকে মৃত ঘোষণার পরই সিয়ামের আচরণে উপস্থিত কয়েকজনের সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি দ্রুত গাড়ি নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করলেও তিনি গাড়ি নিয়ে চলে যেতে সক্ষম হন। পরে স্থানীয় এলাকায় পৌঁছালে লোকজন তাঁকে আটক করে পুলিশকে খবর দেয়। এরপর পলাশবাড়ী থানা পুলিশ গিয়ে তাঁকে আটক করে।


হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সচালক হৃদয় মণ্ডল সংবাদমাধ্যমকে জানান, চিকিৎসক শাহিনাকে মৃত ঘোষণা করার পরপরই তাঁর স্বামীর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। এরপর তিনি দ্রুত গাড়ি চালিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান।


এদিকে শাহিনার পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। নিহতের মা রহিমা বেগমের দাবি, তাঁর মেয়েকে সিয়াম হত্যা করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সিয়াম মাদকাসক্ত এবং বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শাহিনাকে প্রায়ই মারধর করতেন। ঘটনার দিনও শাহিনাকে মারধর করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।


শাহিনার চাচা মাজিদুর রহমানও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, সিয়াম ও শাহিনা কয়েক বছর আগে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের দুটি সন্তান রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ ও নির্যাতনের অভিযোগে অতীতেও একাধিকবার সালিশি বৈঠক হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। অভিযুক্ত সিয়াম বা তাঁর পরিবারের বক্তব্য সংবাদপ্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। ফলে পরিবারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগকে এখনই আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


ঘটনার বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শামা তাবাসসুম। তিনি জানান, শাহিনাকে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর গলায় আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে।


পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরোয়ারে আলম খান জানিয়েছেন, মরদেহের বিভিন্ন অংশে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গলাতেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে গলায় ফাঁস লাগার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য ময়নাতদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।


পুলিশ শাহিনার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ আছে কি না, মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল এবং শাহিনার শরীরে আঘাত কীভাবে হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্ত করছে।


১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, শাহিনার মা রহিমা বেগম বাদী হয়ে মোরসেলিম আকাশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় তাঁর নামের পাশাপাশি আরও দুই থেকে তিনজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।


এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে সরাসরি ‘স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করেছেন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এখন পর্যন্ত সংবাদসূত্রে বিষয়টি হত্যার অভিযোগ ও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। চিকিৎসকের বক্তব্যে মৃতের গলায় আঘাতের চিহ্ন এবং পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের কথা এসেছে। কিন্তু চূড়ান্ত মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফলের ওপর নির্ভর করবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর