বুয়েটের শ্রেণিকক্ষ থেকে 'অ্যাপল' বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর গবেষণায় বিশ্বজয়

বুয়েটের শিক্ষার্থী থেকে বার্কলের অধ্যাপক, গবেষণা থেকে সোনেরা—সায়িফ সালাউদ্দিনের প্রযুক্তি এবার অ্যাপলের অধিগ্রহণে পেল বিশ্বজয়ের নতুন স্বীকৃতি।

বুয়েটের শ্রেণিকক্ষ থেকে 'অ্যাপল' বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর গবেষণায় বিশ্বজয়

বুয়েটের শ্রেণিকক্ষ থেকে 'অ্যাপল' বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর গবেষণায় বিশ্বজয়


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বুয়েটের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলেতে অধ্যাপনা ও গবেষণা, আর সেই গবেষণা থেকে গড়ে ওঠা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—শেষ পর্যন্ত সেই যাত্রা পৌঁছেছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের অধিগ্রহণে। এই সাফল্যের গল্পের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও গবেষক সায়িফ সালাউদ্দিন।

সায়িফ সালাউদ্দিন বুয়েটের তড়িৎ ও তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ থেকে ২০০৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনেই গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। বুয়েটে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি আইইইই বুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৭ সালে তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশলে পিএইচডি অর্জন করেন। মাত্র এক বছর পর, ২০০৮ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে যোগ দেন।

গবেষণার জগতে ধীরে ধীরে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন সায়িফ সালাউদ্দিন। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, স্পিনট্রনিক্স ও কম শক্তি ব্যবহারকারী কম্পিউটিং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পায়। বর্তমানে তিনি বার্কলের তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের টিএসএমসি ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর।

তবে তাঁর সাফল্যের গল্প শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গবেষণাকে বাস্তব প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি গবেষক ডমিনিক লাবানোস্কি ও নিশিতা ডেকার সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ২০১৮ সালে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন সোনেরা ম্যাগনেটিকস।

সোনেরার মূল লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার জন্য নতুন ধরনের ম্যাগনেটোমিটার প্রযুক্তি তৈরি করা। বিশেষ করে মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন অত্যন্ত ক্ষীণ চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার সম্ভাবনা এই প্রযুক্তিকে আলাদা গুরুত্ব দেয়।

বর্তমান প্রযুক্তিতে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিমাপ করতে ব্যবহৃত অনেক পদ্ধতিতে বড় যন্ত্রপাতি, বিশেষ পরিবেশ অথবা শরীরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের প্রয়োজন হতে পারে। সোনেরার গবেষণার লক্ষ্য ছিল তুলনামূলক ছোট, বহনযোগ্য এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কাজ করতে সক্ষম সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ধরনের চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করা।

এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারও ব্যাপক। ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ, স্নায়ু ও পেশির সংকেত শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি, পরিধানযোগ্য যন্ত্র এবং মস্তিষ্ক-কম্পিউটার সংযোগের মতো ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সোনেরার প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পেশির কার্যকলাপ শনাক্ত করার সম্ভাবনা। মানুষের শরীরের পেশি সক্রিয় হলে যে ক্ষীণ চৌম্বকীয় সংকেত তৈরি হয়, তা শনাক্ত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও সহায়ক প্রযুক্তির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

বছরের পর বছর গবেষণা, পরীক্ষা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের পর সোনেরা ম্যাগনেটিকসের সামনে আসে আরও বড় সুযোগ। ২০২৬ সালে অ্যাপল প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণের আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি।

অ্যাপল ঠিক কোন পণ্য বা প্রযুক্তিতে সোনেরার প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে অ্যাপল ওয়াচ, মস্তিষ্ক-কম্পিউটার সংযোগ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ভবিষ্যৎ পণ্যে প্রযুক্তিটি নিশ্চিতভাবেই ব্যবহৃত হবে—এমন দাবি এখনই করা ঠিক হবে না। তবে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যবহার স্বাস্থ্য, প্রবেশগম্যতা, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি এবং মানব-যন্ত্র যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সায়িফ সালাউদ্দিনের এই যাত্রার সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো গবেষণা থেকে প্রযুক্তিতে রূপান্তরের গল্পটি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে তৈরি বৈজ্ঞানিক ধারণা ধীরে ধীরে বাস্তব প্রযুক্তিতে রূপ নিয়েছে। সেই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি প্রতিষ্ঠান। আর শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করেছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি কোম্পানি।

বুয়েট থেকে পারডু, পারডু থেকে বার্কলে—এরপর গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার পথ পেরিয়ে সোনেরা এবং সেখান থেকে অ্যাপল। পুরো যাত্রাটি বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ এই গল্প দেখিয়ে দেয়, গবেষণার ফল শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে না। সঠিক পরিবেশ, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, দক্ষতা ও উদ্যোক্তা মানসিকতার সমন্বয় হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকেই তৈরি হতে পারে এমন প্রযুক্তি, যার প্রতি বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ তৈরি হয়।

সায়িফ সালাউদ্দিনের ক্যারিয়ার তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার উদাহরণ।

বুয়েটের একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাজীবন তাঁকে নিয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে। আর সেই গবেষণার একটি অংশ উদ্যোক্তা উদ্যোগের মাধ্যমে পৌঁছে গেছে অ্যাপলের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে।

বুয়েট → পারডু → বার্কলে → গবেষণা → সোনেরা ম্যাগনেটিকস → অ্যাপল।

এই পথচলার সবচেয়ে বড় বার্তা একটাই—বিশ্বমানের উদ্ভাবনের শুরু সবসময় বিশ্বের বড় কোনো শহর থেকে হতে হবে এমন নয়। কখনো কখনো তার শুরু হতে পারে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট শ্রেণিকক্ষ কিংবা গবেষণাগার থেকেই।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর