ইউরোপে আশ্রয় আবেদন কমলেও বাংলাদেশিদের আবেদন বেড়েছে, শীর্ষ তালিকায় তৃতীয় বাংলাদেশ
ইউরোপে আশ্রয় আবেদন কমলেও বাংলাদেশিদের আবেদন বেড়েছে, ১৯ হাজারের বেশি আবেদন নিয়ে শীর্ষ দেশের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে সামগ্রিকভাবে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করা নাগরিকদের দেশের তালিকায় বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি সুইজারল্যান্ড ও নরওয়েতে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য মোট ৩ লাখ ৩২ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ১৭ শতাংশ কম। ২০২১ সালের পর কোনো বছরের প্রথম ছয় মাসে এটিই সর্বনিম্ন আশ্রয় আবেদন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইইউএএর তথ্য বলছে, ইউরোপে আশ্রয় আবেদন কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন অন্যতম। পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে সিরীয় নাগরিকদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এ ছাড়া উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং অভিবাসীদের উৎপত্তি ও ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সহযোগিতাও আশ্রয় আবেদন কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। তিউনিসিয়া ও মৌরিতানিয়ার মতো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি ও সমন্বয় জোরদার করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
তবে সামগ্রিক প্রবণতার বিপরীতে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের পক্ষ থেকে ১৭ হাজার ৩২৭টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছিল। ২০২৬ সালের একই সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫২১-এ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আশ্রয় আবেদনের সংখ্যার দিক থেকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আফগানিস্তানের নাগরিকরা শীর্ষে রয়েছেন। তাদের আবেদন প্রায় ৩৯ হাজার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভেনেজুয়েলা। আর প্রায় ১৯ হাজার ৫২১টি আবেদন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
তবে বাংলাদেশিদের আবেদনের সংখ্যা বাড়লেও অনুমোদনের হার অত্যন্ত কম। ইইউএএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রথম ধাপের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার ৫ শতাংশেরও নিচে ছিল।
অর্থাৎ ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদন করা বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে খুব অল্পসংখ্যক আবেদনকারী আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। এর ফলে আবেদনকারীদের বড় একটি অংশের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইইউএএ জানিয়েছে, যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার ২০ শতাংশের নিচে, তাদের আবেদন দ্রুত যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো যেসব আবেদন আন্তর্জাতিক সুরক্ষার মানদণ্ড পূরণ করে না, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং প্রত্যাখ্যাত আবেদনকারীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা।
এই দ্রুত প্রক্রিয়ার আওতায় বাংলাদেশও রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ, মিসর, ভেনেজুয়েলা ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন বিশেষ দ্রুত যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বাড়ার বিষয়টি ইউরোপে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে আবেদন অনুমোদনের হার খুব কম হওয়ায় ইউরোপে আশ্রয়প্রত্যাশী বাংলাদেশিদের জন্য আইনি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও বাড়ছে।
ইইউএএর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নিষ্পত্তি হওয়া মোট আশ্রয় আবেদনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও কম আবেদন অনুমোদন পেয়েছে। ফলে ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদন কমলেও যেসব দেশের আবেদন অনুমোদনের হার কম, সেসব দেশের নাগরিকদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি ও প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব বাড়াচ্ছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ।
সামগ্রিকভাবে ইউরোপে আশ্রয় আবেদন কমে এলেও বাংলাদেশিদের আবেদনের বিপরীতমুখী প্রবণতা এখন ইউরোপীয় অভিবাসন নীতির আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশিদের আবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অনুমোদনের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকা—দুই তথ্যই ইউরোপমুখী বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।




