ফোর্ট হুড হামলাকারীর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি দেখানোর ঘোষণা দিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ

যুক্তরাষ্ট্রে ফোর্ট হুড হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ৩ ডিসেম্বর কার্যকরের পরিকল্পনা, জনসাধারণকে দেখানোর কথা জানালেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

ফোর্ট হুড হামলাকারীর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি দেখানোর ঘোষণা দিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ

ফোর্ট হুড হামলাকারীর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি দেখানোর ঘোষণা দিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ


২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটিতে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর সেই ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিদাল মালিক হাসানের সাজা কার্যকরের প্রস্তুতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এবারের আলোচনার সবচেয়ে বড় বিষয় শুধু মৃত্যুদণ্ড নয়, বরং সেই দণ্ড সাধারণ মানুষকে সরাসরি দেখানোর পরিকল্পনা।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা জনসাধারণের দেখার ব্যবস্থা করা হবে। তাঁর বক্তব্যের পর মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, ঘটনাটি সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সম্প্রচারের নির্দিষ্ট মাধ্যম, দর্শকদের প্রবেশাধিকার এবং সম্প্রচারের বিস্তারিত নিয়ম এখনো স্পষ্ট নয়।


মার্কিন সেনাবাহিনীর সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় টেক্সাসের ফোর্ট হুডে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দেন। এরপর সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব অ্যাডাম টেল ৬ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করেন।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা হবে কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। মার্কিন সামরিক বাহিনী সর্বশেষ ১৯৬১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল। আর সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণকারী দলের মাধ্যমে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪৫ সালে। ফলে হাসানের সাজা কার্যকরের পরিকল্পনা দেশটির সামরিক বিচারব্যবস্থার ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিদাল মালিক হাসান পেশায় একজন সামরিক চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীতে মেজর পদে দায়িত্ব পালন করতেন। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুডের একটি সেনা প্রস্তুতি কেন্দ্রে তিনি গুলি চালান। ওই কেন্দ্রে সেনাসদস্যরা চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হামলায় ১৩ জন নিহত হন এবং আরও ৩২ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন সেনাসদস্য এবং একজন ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তি। ঘটনাটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।


হামলার দিন ঘটনাস্থলে থাকা সেনাসদস্য ও অন্য ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। প্রস্তুতি কেন্দ্রের ভেতরে গুলিবর্ষণ শুরু হলে সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের উদ্ধার এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হাসানকে গুলি করে আহত করেন এবং তাঁকে আটক করেন। হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর শরীরের নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ হাসানের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করে। ২০১৩ সালের আগস্টে সামরিক আদালতের বিচারক ও জুরিরা তাঁকে ১৩ জনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। একই সঙ্গে আরও ৩২ জনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগেও তাঁকে দোষী ঘোষণা করা হয়। পরে সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শেষ হয়, যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে প্রয়োজনীয় আপিল ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।


বিচার চলাকালে হাসান নিজের পক্ষে নিজেই বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি হামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের মোতায়েনের বিষয়েও বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে তাঁর যুক্তি আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে তাঁকে মুক্ত করতে পারেনি। আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।


রায়ের পরও মামলাটি বহু বছর ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। মৃত্যুদণ্ডের মামলায় সাজা কার্যকর করার আগে সামরিক বিচারব্যবস্থায় নির্ধারিত পর্যালোচনা ও আপিলের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট হাসানের সামরিক আদালতের রায় পর্যালোচনার আবেদন গ্রহণ করেনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে মৃত্যুদণ্ডের তারিখ ঘোষণা করা মানেই সাজা কার্যকরের সব বাধা দূর হয়ে গেছে, এমন নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসান বেসামরিক আদালতে নতুন আইনি আবেদন করতে পারেন। এ ধরনের আবেদন করা হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়সূচি বিলম্বিত হতে পারে। তাঁর আইনজীবীও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে ৩ ডিসেম্বরের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেদিনই সাজা কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আইনি পরিস্থিতির ওপর।
মৃত্যুদণ্ড জনসাধারণকে দেখানোর পরিকল্পনা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হেগসেথের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের গুরুতর পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং দণ্ডের বাস্তবতা সামনে আনা এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য। তবে মৃত্যুদণ্ডের মতো একটি বিষয় সরাসরি সম্প্রচার করা উচিত কি না, তা নিয়ে আইনগত, নৈতিক ও মানবিক প্রশ্ন রয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রে অতীতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় নির্দিষ্ট কিছু সাক্ষী উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা ছিল। সামরিক বিধিতে অনুমোদিত সাক্ষীদের মধ্যে নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা থাকতে পারেন। কিন্তু অনুমোদিত কয়েকজন সাক্ষীর সামনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আর সেটি সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি সম্প্রচার করা এক বিষয় নয়। এ কারণেই নতুন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং প্রচলিত বিধির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দীর্ঘ বিরতি। ১৯৬১ সালের পর দেশটির সামরিক বাহিনী আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেনি। হাসানের সাজা কার্যকর হলে সেই বিরতির অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে ১৯৪৫ সালের পর সামরিক বাহিনীতে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা ঘটবে। এ কারণে বিষয়টি শুধু একটি অপরাধের বিচার হিসেবে নয়, বরং মার্কিন সামরিক নীতি ও বিচারব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।
ফোর্ট হুডের সেই হামলায় নিহতদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের জন্য এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিচারপ্রক্রিয়ার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি, জনসমক্ষে সম্প্রচার এবং আইনি প্রক্রিয়ার যথাযথ অনুসরণ নিয়ে বিতর্কও চলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে: অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্র কীভাবে বিচারপ্রক্রিয়ার মর্যাদা, আইনগত স্বচ্ছতা এবং মানবিক সীমারেখা বজায় রাখবে?


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর