ব্রঙ্কসে আইস কর্মকর্তার গুলিতে আহত ব্যক্তি, বিক্ষোভে উত্তাল নিউইয়র্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের কাছে অভিবাসনবিরোধী অভিযান চলাকালে এক ব্যক্তিকে গুলি করে আহত করেছেন ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে নিউইয়র্কের মার্বেল হিল এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার কর্মকর্তারা একটি লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানের একপর্যায়ে গুলির ঘটনা ঘটে।
আহত ব্যক্তির বয়স ২৮ বছর। তিনি ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।
নিউইয়র্ক পুলিশের কমিশনার জেসিকা টিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে অন্তত সাতটি গুলি ছোড়া হয়েছিল। ওই ব্যক্তি একটি গাড়িতে অবস্থান করছিলেন। গাড়িটির পেছনের আসনে পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশুও ছিল। তবে শিশুটি শারীরিকভাবে আহত হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড থাকা এক ডমিনিকান নাগরিককে গ্রেপ্তার করতে কর্মকর্তারা সেখানে অভিযান চালাচ্ছিলেন। বিভাগের দাবি, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর চুরির অপরাধে পূর্বে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এ ছাড়া হামলা, ডাকাতি, মাদক ও অস্ত্র-সংক্রান্ত ঘটনায় একাধিকবার গ্রেপ্তারের তথ্যও উল্লেখ করেছে বিভাগটি।
ওই ব্যক্তির সঙ্গে ট্রিনিটারিওস নামের একটি অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
গুলি চালানোর ঠিক আগে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। কী পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা গুলি চালিয়েছিলেন এবং তার সামনে তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ঘটনার পরপরই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আহত ব্যক্তিকে যে হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানেও বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান এবং গুলি চালানোর ঘটনার প্রতিবাদে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড সরানোর চেষ্টা করেন এবং কর্মকর্তাদের দিকে পানির বোতল ছুড়ে মারেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ পদক্ষেপ নেয় এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়।
ঘটনাটি নিয়ে নিউইয়র্কের রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শহরের মেয়র জোহরান মামদানি গুলির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি নিউইয়র্কে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার অভিযান বন্ধের দাবি জানান।
মেয়র বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর এবং কী পরিস্থিতিতে গুলি চালানো হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বিশেষ করে আহত ব্যক্তির গাড়িতে পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশু থাকার বিষয়টি উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলও ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ এবং গুলির ঘটনার ভিডিও জনসমক্ষে আনার আহ্বান জানান। তার মতে, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, গুলি চালানোর ঘটনায় ফেডারেল কর্মকর্তাদের ক্ষমতার ব্যবহার এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিবাসনবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় তদন্তের মাধ্যমে গুলি চালানোর কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং অভিযান পরিচালনার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অভিযানের সময় একটি শিশুর উপস্থিতি। শিশুটি আহত না হলেও গুলির মতো সহিংস ঘটনার কাছাকাছি থাকা তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান পরিচালনার সময় আশপাশে থাকা সাধারণ মানুষ ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হতে পারে।
নিউইয়র্কে অভিবাসন আইন প্রয়োগ নিয়ে আগে থেকেই রাজনৈতিক মতবিরোধ রয়েছে। ফেডারেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা আইন প্রয়োগের অংশ। অন্যদিকে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অধিকারকর্মীরা অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি, বলপ্রয়োগের সীমা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, ব্রঙ্কসের কাছে এই গুলির ঘটনা নিউইয়র্কে অভিবাসন অভিযান ও ফেডারেল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে। এখন তদন্তের ফলাফল, গুলি চালানোর আগে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ এবং ভিডিও প্রমাণ প্রকাশের দিকে নজর রয়েছে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও যাচাইকৃত তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।




