নিউইয়র্কে হাম ছড়িয়ে পড়ায় জরুরি অবস্থা, ২০২৬ সালে আক্রান্ত প্রায় ৩৯০০ জন
নিউইয়র্কে হাম বাড়তে থাকায় জরুরি অবস্থা জারি, টিকা ও পরীক্ষার সুযোগ বাড়িয়ে দ্রুত সংক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
নিউইয়র্কে হাম ছড়িয়ে পড়ায় জরুরি অবস্থা, ২০২৬ সালে আক্রান্ত প্রায় ৩৯০০ জন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে হাম রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর ক্যাথি হকুল ৫ অক্টোবর ২০২৬ রাজ্যজুড়ে দুর্যোগকালীন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। চলতি বছর ৩ অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কে ১০৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯২টি ঘটনা ঘটেছে ১৫ জুলাইয়ের পর। আক্রান্তদের বড় অংশ নিউইয়র্ক শহরের বাইরে বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায়।
নিউইয়র্কে এ বছরের সংক্রমণের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ এবং পর্যাপ্ত টিকা না নেওয়া মানুষের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। নিউইয়র্কের ১০৮টি শনাক্ত রোগীর মধ্যে মাত্র সাতজন নিউইয়র্ক শহরের বাসিন্দা। বাকি ১০১টি ঘটনা রাজ্যের অন্যান্য এলাকায় ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো পাশের অঙ্গরাজ্য পেনসিলভানিয়াতেও হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ২ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ৯৭৭টি আক্রান্তের ঘটনা এবং পাঁচজনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পেনসিলভানিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। ফলে নিউইয়র্কের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালে দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার ৯০০টি হাম আক্রান্তের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে ১৯৯১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে হাম সংক্রমণের সবচেয়ে খারাপ বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বহু বছর ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ আবারও বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে।
নিউইয়র্কের জরুরি অবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হলো আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত টিকাদান বাড়ানো। স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে গ্রামীণ আক্রান্ত এলাকাগুলোতে এক হাজারের বেশি এমএমআর টিকার ডোজ দিয়েছে। এমএমআর টিকা হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।
নতুন জরুরি ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যকর্মীদেরও কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নিবন্ধিত নার্সরা এখন সন্দেহভাজন হাম রোগীর পরীক্ষা করার নির্দেশ দিতে পারবেন। পাশাপাশি ফার্মাসিস্টরা দুই বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের এমএমআর টিকা দিতে পারবেন। এর ফলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার অপেক্ষা না করে অনেক পরিবার দ্রুত পরীক্ষা ও টিকার সুবিধা নিতে পারবে।
অঙ্গরাজ্য সরকার টিকা দেওয়ার তথ্য দ্রুত সরকারি টিকাদান নিবন্ধনে যুক্ত করার ব্যবস্থাও করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এমএমআর টিকা দেওয়ার তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজ্য বা নিউইয়র্ক শহরের টিকাদান নিবন্ধনে জমা দিতে হবে। তবে টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে রোগী বা শিশুর আইনগত অভিভাবকের সম্মতির নিয়ম বহাল রয়েছে। অর্থাৎ জরুরি অবস্থা জারি হলেও জোর করে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
নিউইয়র্ক শহরের বাসিন্দাদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর হলেও শহরটি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। এ বছর এখন পর্যন্ত শহরে সাতটি হাম আক্রান্তের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় সংক্রমণ অনেক বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মানুষের চলাচল ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে রোগটি অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি আশপাশের টিকা না নেওয়া মানুষের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। বিশেষ করে শিশু, টিকা না নেওয়া ব্যক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল মানুষের জন্য ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সিতে বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে ছোট শিশু রয়েছে এবং পরিবারের সদস্যরা স্কুল, কর্মস্থল, গণপরিবহন, দোকান, মসজিদ, কমিউনিটি অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিন চলাচল করেন। ফলে কোনো এলাকায় সংক্রমণ বাড়লে অন্য এলাকাতেও রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
অভিভাবকদের তাই সন্তানদের টিকার রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখা উচিত। শিশুর এমএমআর টিকার ডোজ সম্পূর্ণ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো টিকার কাগজপত্র না থাকলে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুর টিকাদানের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
হামের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে দানা দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ অন্য কিছু রোগের সঙ্গেও মিলতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিজে থেকে রোগ নির্ধারণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি সম্প্রতি এমন এলাকায় ভ্রমণ করে থাকলে যেখানে হাম ছড়িয়ে পড়েছে, অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে থাকলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো জরুরি। সন্দেহ হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার আগে ফোন করে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যাতে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো যায়।
নিউইয়র্কের জরুরি অবস্থা ৪ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকার আক্রান্ত এলাকায় টিকা ও পরীক্ষার কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি সংক্রমণের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। বহু বছর ধরে টিকাদানের মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও টিকা না নেওয়া মানুষের সংখ্যা কোনো কোনো এলাকায় বেড়ে গেলে সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়।