আমেরিকায় বাড়ি কিনতে গিয়ে বড় ধাক্কা, ঋণের সুদ তিন বছরের সর্বোচ্চ

যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছরের বাড়ির ঋণের গড় সুদ বেড়ে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ, নতুন ক্রেতাদের মাসিক কিস্তিতে বাড়ছে চাপ।

আমেরিকায় বাড়ি কিনতে গিয়ে বড় ধাক্কা, ঋণের সুদ তিন বছরের সর্বোচ্চ

আমেরিকায় বাড়ি কিনতে গিয়ে বড় ধাক্কা, ঋণের সুদ তিন বছরের সর্বোচ্চ


যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কিনতে চাওয়া মানুষের জন্য নতুন করে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। ৩০ বছরের স্থির সুদের গৃহঋণের গড় সুদ বেড়ে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে এই হার ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের একই সময়ে গড় হার ছিল ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাড়ি কেনার ঋণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ফ্রেডি ম্যাকের ৮ অক্টোবরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের স্থির সুদের গৃহঋণের হার এখন ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে। একই সপ্তাহে ১৫ বছরের স্থির সুদের গৃহঋণের গড় হারও বেড়ে ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছে। এক সপ্তাহ আগে ১৫ বছরের ঋণের হার ছিল ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ।

বাড়ি কিনতে আগ্রহী পরিবারগুলোর জন্য এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মাসিক কিস্তিতে। একই দামের বাড়ি কিনলেও সুদের হার বেশি হলে ঋণের মোট খরচ বাড়ে। ফলে আগে যে পরিবার একটি নির্দিষ্ট দামের বাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখত, এখন তাদের হয় বেশি মাসিক কিস্তি দিতে হবে, নয়তো কম দামের বাড়ি খুঁজতে হবে।


বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির মতো উচ্চমূল্যের আবাসন বাজারে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকায় বাড়ির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় ঋণের সুদ সামান্য বাড়লেও মাসিক কিস্তিতে তার প্রভাব বড় হতে পারে।


ধরা যাক, একজন ক্রেতা ৫ লাখ ডলারের বাড়ি কিনছেন এবং ২০ শতাংশ অগ্রিম দেওয়ার পর ৪ লাখ ডলার ঋণ নিচ্ছেন। ৩০ বছরের জন্য ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে শুধু মূলধন ও সুদের মাসিক কিস্তি প্রায় ২ হাজার ৭৬৪ ডলার হতে পারে। এর সঙ্গে বাড়ির কর, বীমা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য খরচ যোগ হলে প্রকৃত মাসিক ব্যয় আরও বেশি হবে।


এক বছর আগে একই পরিমাণ ঋণের গড় সুদ যদি ৬ দশমিক ৩০ শতাংশের কাছাকাছি থাকত, তাহলে মূলধন ও সুদের মাসিক কিস্তি প্রায় ২ হাজার ৪৭৭ ডলার হতো। অর্থাৎ একই ৪ লাখ ডলারের ঋণে শুধু সুদের হারের পার্থক্যেই মাসে প্রায় ২৮৭ ডলার অতিরিক্ত দিতে হতে পারে। ৩০ বছরে এই পার্থক্য অনেক বড় অঙ্কে পৌঁছাতে পারে।


তবে বাস্তবে কোনো ব্যক্তির কিস্তি শুধু বাজারের গড় সুদের ওপর নির্ভর করে না। ঋণগ্রহীতার ঋণযোগ্যতার মান, অগ্রিম অর্থের পরিমাণ, ঋণের ধরন, বাড়ির অবস্থান, সম্পত্তির কর, বীমা এবং ঋণদাতার শর্ত অনুযায়ী প্রকৃত সুদের হার ভিন্ন হতে পারে।


ফ্রেডি ম্যাকও বলেছে, বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল হওয়ায় বাড়ি কেনার আগে একাধিক ঋণদাতার কাছ থেকে সুদের হার ও শর্তের প্রস্তাব নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামান্য সুদের পার্থক্যও দীর্ঘমেয়াদে হাজার হাজার ডলারের পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

এই মুহূর্তে শুধু সুদের হারই বাড়ির ক্রেতাদের সমস্যায় ফেলছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক এলাকায় বাড়ির দাম এখনও সাধারণ পরিবারের আয়ের তুলনায় বেশি। ফলে ক্রেতারা একই সঙ্গে দুই ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন—একদিকে বাড়ির দাম, অন্যদিকে ঋণের খরচ।


এর প্রভাব বাড়ি বিক্রির বাজারেও দেখা যাচ্ছে। বেশি সুদের কারণে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন অথবা কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে যেসব বাড়ির মালিক কয়েক বছর আগে অনেক কম সুদে ঋণ নিয়েছেন, তাদের অনেকে নতুন বাড়ি কিনতে আগ্রহী হলেও পুরোনো কম সুদের ঋণ ছেড়ে বেশি সুদের নতুন ঋণ নিতে চাইছেন না।

ফলে বাজারে বাড়ির সরবরাহও সীমিত থাকতে পারে। একজন বাড়ির মালিক যদি ৩ শতাংশের কাছাকাছি পুরোনো সুদে ঋণ নিয়ে থাকেন, তাহলে নতুন বাড়ি কিনে ৭ শতাংশের বেশি সুদের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তার জন্য কঠিন হতে পারে। এই কারণেই উচ্চ সুদের বাজারে অনেক মালিক তাদের বর্তমান বাড়িতেই থেকে যাচ্ছেন।


অর্থনীতিবিদদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি কেনাবেচা কমে গেলে আবাসন নির্মাণ, বাড়ি সংস্কার, আসবাবপত্র, গৃহস্থালি সরঞ্জাম এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ একটি বাড়ি কেনার সঙ্গে শুধু বাড়ির দাম নয়, আরও অনেক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত থাকে।

সুদের হার কেন এত বাড়ছে—এ প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদ বেড়েছে। ১০ বছরের সরকারি ঋণের সুদ গৃহঋণের সুদের হারের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা, জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ বেড়েছে, যার প্রভাব গৃহঋণেও পড়ছে।


রিয়েলটর ডটকমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৩০ বছরের গৃহঋণের সুদ টানা সপ্তম সপ্তাহে বেড়েছে। এক বছর আগে ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ থাকা হার এখন ৭ দশমিক ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে হার ১ দশমিক ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।

এতে প্রথমবার বাড়ি কিনতে চাওয়া তরুণ পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে। কারণ তাদের অনেকের কাছে বড় অগ্রিম অর্থ জমা নেই। ফলে তুলনামূলকভাবে বেশি ঋণ নিতে হয়। সুদের হার বেড়ে গেলে মাসিক কিস্তি তাদের আয়ের বড় অংশ দখল করতে পারে।


নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যারা কয়েক বছর ধরে বাড়ি কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছেন, তাদের এখন শুধু বাড়ির বিক্রয়মূল্য দেখলে হবে না। মাসিক ঋণ, সম্পত্তির কর, বাড়ির বীমা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য অন্যান্য খরচ একসঙ্গে হিসাব করতে হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর